চোখের বৃষ্টি

তখন টুকটাক একটু আধটু লেখালেখি করি। লেখালেখি মানে ফেসবুকে নোট লেখা আরকি। নিজের নোটে আর দু একটা পেজে গল্প আর কবিতা লেখি। কেউ প্রশংসা করলে ভালই লাগে। একদিন হঠাত্‍ ফেসবুকে ঢুকে দেখি ইনবক্সে নতুন একটা মেসেজ। মেসেজটা খুলে কিছুটা ধাক্কাই খেলাম। অপরিচিত একটা মেয়ের মেসেজ। কন্যার নাম হৃদিতা তাবাসসুম।

লিখেছে,
“এই যে সাহেব, লেখেন তো ভালই। কিন্তু আপনার সব লেখাগুলো এত মন খারাপ করা কেন? আমাকে এরকম একটা গল্প লিখে দিতে পারবেন যেটা পড়লেই মন ভাল হয়ে যায়?”
আমি কি উত্তর দিয়েছিলাম মনে পড়ছেনা। তবে এটা মনে আছে গল্প দিয়ে নাহলেও অন্য কোনভাবে তার মন ভাল করার চাকরিটা নিয়েছিলাম। তারপর থেকে টুকটাক মেসেজ পাঠানো। হাই, হ্যালো, হাউ আর ইউ এইসব আরকি!

এমনভাবেই চলছিল, হয়ত আরো কিছুদিন চলত যদি ঐদিন অমনভাবে বৃষ্টি না হতো।
একদিন সকালে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। শ্রীকান্ত, নিয়াজ মহম্মদ আর রবীন্দ্রনাথের সাথে টিনের চালে বৃষ্টির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। এতসব ছেড়ে বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছা করছিল না। তাই বিছানায় শুয়ে বৃষ্টির শব্দ আর গান শুনছিলাম। ঘোর কাটল একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন পেয়ে।”হ্যালো, আমি হৃদিতা।”

আমি একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। ঠিক আকাশ থেকে পড়লাম বললেও কম করে বলা হবে, একেবারে সৌরজগতের বাইরে থেকে পৃথিবীতে এসে পড়লাম। হৃদিতা আমার ফোন নম্বর পাবে কোথায়? ওপাশের কন্ঠস্বর আবারো শুনতে পেলাম।
-হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন?
-হ্যা, হৃদিতা। কেমন আছ?
-আমার খুব মন খারাপ। আপনাকে একটা গল্প লিখতে বলেছিলাম যা পড়লে মন ভাল হয়ে যায়। আপনি লিখলেন না যে? এখন কথাবলে আমার মন ভাল করে দিতে হবে।
-হৃদিতা, আমি তো কথা বলে কারো মন ভাল করতে পারিনা। আমার সাথে কিছুক্ষণ কথা বললে মানুষের মন আরো খারাপ হয়ে যায়।
-তাহলে আমার মন আরেকটু খারাপ করে দিন।

সেই শুরু। তারপর অপরিচিত নম্বরটা খুব পরিচিত হতে সময় লাগলনা। ওই প্রায় সময় ফোন করত। বেশিরভাগ সময় বৃষ্টি হলেই ফোন করত। একদিন ঠিক করলাম দেখা করবো। ঠিক হলো, যেদিন খুব বৃষ্টি হবে সেদিন ওর হলের সামনের রাস্তায় আমি কদম ফুল নিয়ে অপেক্ষা করবো। আর ও নীল শাড়িপড়ে আসবে।
দিন চলে যায়, বৃষ্টি আর হয় না। তারপর হঠাত্‍ একদিন তুমুল বৃষ্টিতে চারচোখের মিলন হলো। সেদিন অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলাম। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ফুসকা খেলাম। বৃষ্টি শেষে রোদ উঠল, ভেজা কাপড় শুকিয়ে গেল। কিন্তু গল্প ফুরোয় না।

প্রায়ই দেখা হত, ফোনে কথা হত আগেরচেয়ে অনেক বেশি। একদিন বৃষ্টির মধ্যে ফোন করে বললো, “এই আমার না খুব কদম ফুল পেতে ইচ্ছা করছে।” শরীর কিছুটা খারাপ ছিল। কেয়ার করলাম না। অনেক কষ্টে বৃষ্টিতে ভিজে কদম ফুল জোগাড় করলাম। তারপর বৃষ্টিতে ভিজেই ওকে দিয়ে আসলাম। সেদিন বাসায় ফিরে প্রচন্ড জ্বর শুরু হল। শুনে ও অনেক কান্নাকাটি করল। আমি এত করেই বুঝাই কিন্তু ওর কান্না শেষ হয় না। ওর কান্না শেষ না হলেও আমার শখের বৃষ্টিতে ঐদিনই শেষ হয়ে গেল। এরপর বৃষ্টি হলেই ও ফোন করে বলতো, “এই, একদম বৃষ্টিতে ভিজবে না। বৃষ্টিতে ভিজে আবার যদি জ্বর বাধাও, তাহলে কিন্তু তোমার সাথে তিন দিনে কথা বলব না।”

এভাবে ভালই কেটে যাচ্ছিল। পৃথিবীটাকে স্বর্গ মনে হত। প্রতি মুহুর্ত বেঁচে থাকাটাকে আনন্দের মনে হত। ওর অম্লমধুর শাসন আর অভিমান গুলো বিধাতার বিশেষ মেহেরবানি মনে হত।
গল্পটা এভাবে শেষ হলে ভাল হত। কিন্তু না, গল্পটা ট্রাজেডি হয়ে গেল।
ফেসবুকে অধরা নামে আরো একটা মেয়ে আমাকে মেসেজ পাঠাত। তার সাথে সম্পর্কটা ছিল মূলত বন্ধুত্বের। অধরা মেসেজে প্রচুর ফান করত। আমিও ফান করেই রিপ্লাই দিতাম। হৃদিতার সাথে রিলেশনশীপ স্ট্যাটাস দেখে ও একদিন মেসেজ পাঠালো, “এই,এইটা তুমি কি করলা? তুমি না আমাকে ভালবাস? ঐ মেয়েটা আবার আসলো কোথা থেকে?” আমিও ফান করে লিখেছিলাম, “আমি আসলে তোমাকেই ভালবাসি। অন্যসব ভুয়া।” পরে অবশ্য ফোনে অধরাকে সব বুঝিয়ে বলেছিলাম। তবে মেসেজে ঐ ধরণের ফান চলতেই থাকত।
একদিন হৃদিতার কাছে ফোন রেখে আমিআইসক্রিম কিনতে গিয়েছিলাম।

ফিরে এসে দেখি ওর মুড অফ। হলে ফিরে যেতে চাইল। বাসায় ফিরে একটা মেসেজ পেলাম, “তুমি আর কক্ষণো আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। কোন কারন জিজ্ঞাসা করবেনা। শুধু একটা ব্যাপার, যদি তুমি কোন রকম যোগাযোগের চেষ্টা করো তাহলে কিছু একটা করে ফেলব আমি।”
আমি তো পুরো হতভম্ব হয়ে গেলাম। ফোন করলাম, ফোন বন্ধ। ব্রাউজার হিস্টোরি চেক করে দেখি অধরার মেসেজগুলো। আবার কল করতে গিয়ে কললগে দেখলাম অধরা ফোন করেছিল। অধরাকে ফোন করলাম। জিজ্ঞেস করলাম আগেরবার ফোন করে কি বলেছে। ও বললো শুধু বলেছে,”জান তুমি কই?” আমি কথা না বলে ফোন রেখে দিলাম। অধরার কথাটা হৃদিতাকে বলেছিলাম। কিন্তু ও মেসেজগুলোর কথা জানতো না। বুঝলাম মেসেজে আর ফোন, দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ও আমাকে অনেকখানি ভুল বুঝেছে।….সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে পরদিন ওর হলে যোগাযোগ করে জানলাম ও খুব সকালে কুমিল্লায় ওদের নিজেদের বাড়িতে চলে গেছে। কেউ ঠিকানা দিতে পারলো না।
তারপর আর ওর সাথে দেখা বা কথা হয়নি। ওর ফোনটা সবসময় বন্ধ থাকে, ভার্সিটিতেও আর আসেনা। সুন্দর এই পৃথিবীটাকে আমার অসহ্য মনে হয়।

এখনো মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। আমি ভিজতে সাহস করি না। মনেহয় ও এখনই ফোন করে বলবে, “এই,একদম বৃষ্টিতে ভিজবে না। আবার যদি জ্বর বাধাও, তাহলে তোমার সাথে তিনদিন কথা বলবো না কিন্তু।”
জানি ও কখনোই আর ফোন করবে না। তারপরও আনমনে বৃষ্টির দিনে হঠাত্‍ ফোন বেজে উঠলে দৌড়ে যাই। কাপা কাপা কন্ঠে বলি, “হ্যালো, আমাকে শুধু একটিবার সুযোগ দাও। আমি তোমাকে সব খুলে বলব। প্লীজ,মাত্র একটিবার।” ও পাশের কন্ঠস্বর শুনে সম্বিত ফিরে পাই।

মেঘের বৃষ্টিতে আমার কখনোই ভেজেহয় না। আমি চোখের বৃষ্টিতে ভিজি।♥♥♥

____THE END____

সরি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম

একদিন খুব ভোরে সকালে হাটতে বের হয়ে ছেলেটির দেখা হয় মেয়েটির সাথে। প্রথম দেখাতেই বুকের ভেতর কেমন যেন অনুভব হয় ছেলেটির। মেয়েটি তার পাশ দিয়ে হেটে যায়, ছেলেটি পাশ থেকে তার চুলের ঘ্রাণ নেয় আর অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পরদিন ঠিক একই সময়, একই স্থানে যেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ছেলেটি। ১০০ থেকে উলটো দিকে গুনতে থাকে। না, সেদিন আর দেখা হলোনা। এরপর দিন আবারো একই স্থানে, একই সময় অপেষ্কা। নিজে নিজে ভাবে। আসবে কি সে? নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করে। কিসের টানে দাঁড়িয়ে আছি আমি? আমিতো তাকে চিনিনা। আগে কখনো দেখিনি। দু’চোখ বন্ধ করে, হঠাৎ সেই পরিচিত মাথা নষ্ট করা ঘ্রাণে ছেলেটির বোধ ফিরে আসে। চোখ খুলে দেখে, এক মূহুর্ত আগেই মেয়েটি তাকে অতিক্রম করে গেল। না, আজ আর হারানো যাবেনা। পিছু নিল মেয়েটির। কিছু দূর যাবার পর মেয়েটি খেয়াল করে।
খুব ভদ্রভাবেই মেয়েটি জানতে চায় তাকে অনুসরণ করার উদ্দেশ্য। ছেলেটি কিছু বলতে পারেনা, শুধুই ফেল ফেল করে চেয়ে থাকে মেয়েটির চেহারার দিকে। পাগল মনে করে মেয়েটি তার হাঁটার বিরতির ইতি টানে। এবার ছেলেটি পেছন থেকে হাত দিয়ে ছুয়ে দেখে মেয়েটির চুল। কাছে নিয়ে নাকে চেপে ধরে ঘ্রাণ নেয়। মেয়েটিও সেদিন কিছু বলতে পারেনা। এভাবেই ধীরে ধীরে তাদের কাছে আসা, এক সময় ফোন নাম্বার চাওয়া এবং কথা বলা, ভাল লাগা এবং ভালবাসা।

এক সময় তারা নিজেরা ভাবে, এভাবে আর কতদিন। নিজেরাই সবাইকে জানান দিয়ে বসে বিয়ের পিড়িতে। প্রতিদিন মেয়েটি খুব ভরে উঠে নাশ্তা বানায় তার প্রাণপ্রিয় বরের জন্য। ছেলেটি তার স্ত্রীর হাতের নাশ্তা না খেয়ে বের হলে নাকি সারাদিন কোন কাজে মন বসাতে পারেনা। যেদিন দুপুরে মেয়েটি ফোন করতে ভুলে যায় সেদিন ছেলেটি না খেয়ে থাকে। রাতে এক সাথে একটেবিলে না খেলে নাকি কারোই ঘুম হয়না। ধীরে ধীরে ছেলেটির ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। কত সুন্দর দিলগুলো। আস্তে আস্তে স্মৃতি হতে থাকে। রাতে দেরী করে ঘরে ফেরাটাই যেন এখন স্বাভাবিক। তারপরও মেয়েটি বসে থাকে টেবিলে খাবার সাজিয়ে। ছেলেটি যত রাতেই ফিরে, চেয়ারে বসে অপেক্ষায় থাকে মেয়েটি। এর মাঝে চোখ বুজে আসে। ছেলেটি সামনে এসে দাঁড়ালে, মেয়েটি বলে, ” সরি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম “।
এভাবে যতই দিন যেতে থাকে, মেয়েটি যেন তার সবচাইতে বেশি ভালবাসার মানুষটি থেকে দূরে সরতে থাকে। ছেলেটিও তা বুঝতে পারে। কিন্তু তাই বলে ভালবাসার কমতি হয়নি তাদের মাঝে। এক সময় ছেলেটি মেয়েটিকে বলে, তুমি যেহেতু সারাদিন সময় পার করতে পার না, তুমি চাইলে কিছু করতে পার। স্কুলজীবন থেকেই মেয়েটি জড়িত ছিল অভিনয়ে। কিন্তু বিয়ের পর আর তা করা হয়নি। মেয়েটি ভাবে, হাতে যেহেতু সময় আছে, এক আধটু করলে সমস্যা নেই। ছেলেটির সম্মতির কথা জানতে চাইলে সেও না করেনা। আবারও মেয়েটি শুরু করে তার অভিনয়। যতই দিন যায়, মেয়েটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। সাথে বাড়তে থাকে তার ব্যস্ততা। আর্থিক সচ্চলতা অনেক বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে তাদের দু’জনেরই দেখা দেয় অভাব। আর এই অভাব হলো সময়ের। মাঝে মাঝে ৩/৪ দিন তো তাদের একে অপরের সাথে দেখা না করেই কাটে।
এমনই একদিন ছেলেটি বাসায় ফিরে খুব তাড়াতাড়ি। এর আগের ৪ দিন তার সাথে দেখা হয়নি মেয়েটির। একজন ঘুমানোর পরে আরেকজন ঘরে ফেরে, আবার অন্যজন ঘুম থেকেউঠার আগেই বের হয়ে যায় অপরজন। ছেলেটি ভাবে, অনেকদিন একসাথে বসে চা খাওয়া হয়না। ফোন করে মেয়েটির মোবাইলে। জানতে পারে আধ ঘন্টার মধ্যেই ফিরবে মেয়েটি। চুলায় চা বসিয়ে দিয়ে টিভি দেখতে শুরু করে। মোটামুটি সবকটি চ্যানেলেই তার স্ত্রীর জনপ্রিয়তা। ভাললাগে তার। অপেক্ষা করছে মেয়েটির জন্য। চা বানিয়ে নিয়ে টেবিলে সাজিয়ে বসে, এই বুঝি এসে পড়লো। এভাবে চলে যায় প্রায় ৪টি ঘন্টা। নিজে নিজে চেয়ার বদলিয়ে অভিনয় করে। নিজে নিজে কথা বলে, যেন সামনে বসে আছে মেয়েটি। অবশেষে রাতে খাবার টেবিলে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করে মেয়েটির জন্য। অপেক্ষা করতে করতে এক সময় টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে ছেলেটি। মেয়েটি বাসায় ফিরেটেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালে ছেলেটি বলে, ” সরি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম “।

….The End….

সম্পূর্ণ সত্যি ঘটনা। এমন ঘটনা এখন পাওয়া দুর্লভ।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়। শরতের আকাশ সাদা সাদা, ঈষত্‍ ধূসর ছাইরাঙা মেঘগুলি গোল্লাছুট খেলে, দুরন্ত শিশুর মত। আর মেঘের এই দুরন্ত দস্যিপনার কাছে দুপুরের তপ্ত সূর্য মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়। এমনই এক আধো বাদলা আধো রোদেলা দিনে হাটিম কূল মুক্তিযোদ্ধাদের বেইজ ক্যাম্পে এক ভিখারী প্রবেশ করে। গায়ের পোষাকটা বেশ চটকদার। রংবেরঙের তালি মারা জীর্ণ আলখেল্লা, হাতে লাঠি, লম্বা শ্বেত, শূভ্র দাঁড়ি-চুল। শরিফ ফকিরটির গতিরোধ করে বলে, “তুমি কে?”

ফকির, “আমি গণি, মুক্তিযোদ্ধা, জয় বাংলার লোক।”

শরিফঃ কাকে চাই?

গণি ফকিরঃ কমান্ডারের কাছে যাব।

শরিফঃ কেন?

গণি ফকিরঃ সেক্টর কমান্ডার পাঠিয়েছেন,গোপন কথা আছে।

শরিফঃ পাস কোড বল।

গণি ফকিরঃ পাতি হাঁস।

শরিফঃ ঠিক আছে, চলো।

শরিফ আর গণি ফকির ধীরে ধীরে আধা পাকা স্কুল ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে শরিফ স্যালুট দেয়। দেখতে পায় কমান্ডার মানচিত্রের দিকে নিবিষ্ট মনে কুচকানোভু নিয়ে তাকিয়ে আছে। হাতে পেন্সিল, স্কেল আর কম্পাস দিয়ে কিসের যেন মাপজোক করছে। শরিফকে দেখে বলে, “আরে শরিফ বসো, বলো কি জন্যে এসেছ?” শরিফ কমান্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় কয়েক রাত না ঘুমানো এক জোড়া লাল রক্ত চক্ষু।

শরিফঃ কমান্ডার এক অগন্তুক আপনার সাথে কথা বলতে চায়!

কমান্ডারঃ ভেতরে আসতে বল।

শরিফ গণি ফকিরকে ভেতরে আসতে বলে। গণি ফকির এসে স্যালুট দিয়ে বলে, “কমান্ডার সেক্টর কমান্ডার আপনাকে একটি পত্র পাঠিয়েছেন, এই নিন।” —বলে কমান্ডারের কোমরে থাকা একখানি কাগজ এগিয়ে দেয়।

কমান্ডার দেখতে পায় সেক্টর কমান্ডারের নিজ হাতে লেখা ও সাক্ষরিত একটি চিঠি। যাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ধূপখোলা গ্রামের পশ্চিমে যে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার আছে তা বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে। যথা সময়ে এক্সপ্লোসিভ আমুনিশন কমান্ডারের নিকট পৌছে যাবে। কমান্ডার বুঝতে পারে এই ৪০০০ কিলোভোল্ট লাইনের মাধ্যমেই শহরে বিদ্যত্‍ সরবরাহ করা হয়। যদি এটি ধ্বংস করা যায় তাহলে সমস্ত শহর রাতের আঁধারে ভুতুরে নগরীতে পরিণত হবে। এতে করে অপারেশন চালানো বেশ সহজ হবে। খুব সহজেই পাক বাহিনীকে কোণ ঠাসা করা যাবে। হযত এই বৈদ্যুতিক লাইন বিকল করার মাধ্যমেই সেক্টর কমান্ডার বড় ধরণের যুদ্ধ শুরু করতে চাচ্ছেন। যাই হোক এমন একটা নির্দেশ পেয়ে কমান্ডার বেশ উত্‍ফুল্ল মেজাজে কাজ শুরু করে। সে শরিফ, পাচু, সামাদ, সিরাজ, বরকতসহ আরো কিছু চৌকশ তরুণ যোদ্ধাদের নিয়ে একটা বিশেষ দল গঠন করে।

সবাই গোপন বৈঠকে বসে। কমান্ডার সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশ সবাইকে জানায় এবং তাদের প্রস্তুত হতে বলে। সে তাদের জানায় যে এটি একটি বড় যুদ্ধ শুরুর আলামত সবাইকে মানসিক প্রস্তুতি নিতে বলে। একথা শুনে শরিফ প্রস্তাব করে যে তারা কয়েকজন শহরের দিকে এগিয়ে গিয়ে রোজ গভীর রাতে শহরের দিকে তাক করে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়বে। পাল্টা ওরা নিশ্চয় অনেক গুলি ছুড়বে, এতে করে তাদের গুলির মজুদ কিছুটা হলেও কমবে। কমান্ডার জানায় যে আজ রাতেই পরীক্ষমূলকভাবে করতে। যদি ভালো কাজ হয় তবে রোজ তা করা হবে। কমান্ডারের নির্দেশ পেয়ে শরিফ আর পাচু সে রাতেই শহরের দিকে ৩ কি.মি পথ পায়ে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে ফাঁকা ফায়ার করল। একজন শহরের পূবদিক বরাবর অন্যজন পশ্চিমদিক বরাবর। ব্যাস যে কথা সেই কাজ। পাক বাহিনী পাল্টা জবাবে ছুড়ল হাজার রাউন্ড গুলি। আবার সেই রাতে শরিফ আর পাচু দেখতে পায় আকাশে অসংখ্য তপ্ত শিশার আলোক ছটা। বেশি পরিমাণে ফাঁকা গুলি বর্ষণ করলো যে কানে তালা লাগায় উপক্রম। নিস্তব্ধ কালো অন্ধকারকে ভেদ করে সেই শব্দ পৌছে গেল শহর থেকে ৫কিমি দূরের হাটিম কূল বেইজ ক্যাম্পে। কমান্ডারের মুখে তৃপ্তির হাসি। ২ঘন্টা পর দুই বীরযোদ্ধা শরীফ আর পাচু ফেরত আসে।

পরেরদিন ভোরবেলায় জেলের ছদ্মবেশে কমান্ডার শরীফ আর পাচুকে পাঠায় ধূপখোলা ট্রান্সফর্মার সরেজমিনে দেখে আসার জন্য। তারা সারাদিন পায়ে হেঁটে ৪ঘন্টা পর পৌছে ১০কিমি দূরের ধূপখোলা ট্রান্সফর্মারের কাছে। সেখানে দেখতে পায় চারদিকে ১কিমি মধ্যে কোন বাড়ি নেই। শুধু থৈ থৈ হাঁটু পানি, আমনের ক্ষেত। ২০০ গজ দূরে একদিকে পাকা রাস্তা, দুইদিকে গাঁয়ের মেঠো রাস্তা, ১কিমি দূরে গ্রাম। মাঝে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় বৈদ্যুতিক খুঁটি। তারি মাঝে একটি খুঁটিতে ট্রান্সফর্মারটা বসানো। ফেরার পথে তারা বেশ কিছু মাছ ধরে আনে। বেশ কয়েকদিন পর ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা রাতের খাবারে ডাল ভাতের সাথে মাছের ঝোল পেয়ে বেশ খুশি। তিনদিন পর দুপুর বেলা ক্যাম্পের সামনে একটি গরুর গাড়ি এসে থামে, যার উপর বেশ কয়েকটি গুড়ের পাত্র। চালক নেমে প্রহরারত মুক্তিযোদ্ধাকে বলে কমান্ডারকে ডেকে দিতে। কমান্ডার আসলে তার হাতে একটি পত্র দেওয়া হয়। পত্রটিতে নির্দেশ আছে, “আজ রাতেই অপারশন করতে হবে,পর্যাপ্ত এক্সপ্লোসিভ দেওয়া হল।” অতঃপর কমান্ডার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে গুড়ের পাত্রগুলো নামিয়ে নিতে বলে।

প্রকৃতপক্ষে ঐ গুড়ের মাঝেই সংরক্ষিত অবস্হায় লুকানো ছিল আমুনিশন ও এক্সপ্লোসিভ। রাত দশটার দিকে কমান্ডার ,শরীফ,পাচু, সিরাজসহ ১০ মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গেল ধূপখোলা মাঠের দিকে। সবার কাছে একটি করে হালকা মেশিন গান,পর্যাপ্ত গুলি কোমরে বাঁধা। দুইজন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দুই কার্টুন ভরা এক্সপ্লোসিভ। সবার সামনে কমান্ডার, তার পিছনে শরিফ, তারপর পাচু তার অন্যান্যরা। পিপীলিকার দলের মত তারা বেশ খানিকটা দুরত্ব রেখে লাইন ধরে পাকা রাস্তা হবে বেশ দূর দিয়ে ধান ক্ষেতের আল ধরে যাচ্ছে। যাতে করে এমবুশের শিকার হলে বড় মাপের ক্ষতি না হয়, আর রাস্তায় যদি টহল সেনারা আসে তবে তাদের যেন দেখতে না পায়। রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারকে ভেদ করে কয়েকজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে চলেন সামনের দিকে। এমনিতেই আমাবস্যার পর আজই ১ম চাঁদ উঠেছে। তবে আকাশে মেঘ থাকার কারণে চাঁদ বা তারার কোন আলো নাই। চারিদিকে আলকাতরার মত অন্ধকার। মুক্তিযোদ্ধারা চলছেন ছন্দময় গতিতে সারিবদ্ধ হয়ে। তবে তাদের ছন্দপতন হচ্ছে যখন কার্টুন বহনকারী যোদ্ধারা কার্টুন দুটি তাদের সহযোদ্ধাদের বদল করছেন। এলাকাটি কমান্ডারের নিজের এলাকা হওয়ায় পথ ভালোই চেনা।

কমান্ডার চলতে চলতে হঠাত্‍ তিনি সবাইকে থামতে নির্দেশ দিলেন। সবাই ভাবলো হয়ত যাত্রা বিরতি। কিন্তু তা না। কমান্ডার সবাইকে দ্রুত বসে পড়তে বললেন। যোদ্ধারা ক্ষেতের আলের উপর বসে পড়ল। তারপর কমান্ডার সবাইকে চার আলের মাঝে গোল হয়ে বসতে বললেন। তারপর সবার মাঝে বসে বললেন, “সামনে মনে হয় রাজাকার আছে,আমি বিড়ির আগুন দেখতে পেয়েছি।” তারপর সবাই মাথা উঁচু করে দেখতে পায় প্রায় আধা কিমি দূরে পাকা রাস্তা হতে যে মেঠো রাস্তা গ্রামের দিকে চলে গেছে সেই রাস্তার মাঝে একটি সিগারেটের আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। আগুনটা একবার বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠল তারপর আবার খানিকটা স্হিমিত হয়ে গেল। অতঃপর পূর্বের স্হানে আগুনটি ফিরে এসে পুনরায় জ্বলে উঠল।কারো বুঝতে বাকি রইল না যে ওখানে দুজন মানুষ আছে,আর আগুনের উচ্চতা দেখে মনে হল যে তারা উবু হয়ে বসে আছে। কমান্ডার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো এই ভেবে,এটা মোটামুটি মুক্ত এলাকা। কিন্তু রাজাকার আসবে কোথা হতে? নাকি ওরা সাধারণ গ্রামের মানুষ। কিন্তু এই রাত সাড়ে এগারটায় গ্রামের মানুষ এখানে আসবে কেনো??? তারপরেও ধরতে গেলে গ্রামে কোন মানুষ নেই। অতঃপর কমান্ডার শরীফ আর সিরাজকে নির্দেশ দিল যে ওদের কাছে গিয়ে দেখতে ওরা রাজাকার কি না সাধারণ মানুষ।

নির্দেশ পাওয়া মাত্র শরিফ আর সিরাজ ক্রলিং করে আলের উপর দিয়ে পাকা রাস্তার পাশে যে নালা ছিল তাতে নেমে গেল। কতগুলি কচুরিপানাকে ঢিবির মত করে তার উপর গুলির ম্যাগাজিন আর মেশিন গান রেখে আরো কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিল। অতঃপর তারা দুজন কিছু কচুরি পানা এক সাথে করে বড় একটা দল তৈরী করে তার মাঝে লুকিয়ে সামনের দিকে স্রোতের সাথে ভেসে চলল। যাওয়ার সময় তারা ঠেলে গোলা বারুদ লুকানো কচুরির ঢিবিটাকে নিয়ে চলল। প্রায় ২০মিনিট পর তারা পাকারাস্তা আর গ্রামের মেঠো পথের সংযোগকারী বাঁশের সাঁকোর এর কাছে পৌছাল তখন দেখতে পেল যে, মানুষ দুটি তাদের দিকে মুখ করে বসে আছে। তাদের দু একটা দেখছি তাওতো শালারা খেয়ে আমাদের ছোবড়া দেয়,”হোসেনের মেয়েটাকে অনেক ভালবাসতাম।ভাবলাম আমি তুলে নিয়ে বিয়ে করব, কিন্তু চেয়ারম্যান জসিম কুত্তা কেড়ে নিয়ে গেল।”তুলে দিল অফিসারদের কাছে। নিজেও কিছু পেলনা,আমাকেও কিছু দিল না। “কথাগুলা শুনে শরিফ আর সিরাজের বুঝতে বাঁকি রইল না যে এরা বাঙালি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কুলাঙ্গার সন্তান। তাদের দুজনের রক্তে আগুন ধরে গেল। শরিফ হাতে বেয়নেট নিয়ে চুপি চুপি এগিয়ে গেল, তার পিছু পিছু সিরাজ। নিঃশব্দে তারা রাজাকার দুটির পেছনে এসে দাঁড়াল। দুজন একসাথে রাজাকার দুটির মুখ চেপে ধরে বেয়নেট রাজাকার দুটির কন্ঠ নালীর মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়! সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে জানোয়ার দুটির অপবিত্র রক্ত বেরিয়ে আসে। ভিজে যায় সোনার বাংলার পবিত্র মাটি! শয়তান দুটির কাটা গলা থেকে বেরিয়ে আসে সদ্য জবাই করা গরুর গোঙানীর মত শব্দ, যা রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে দেয়। কিছুক্ষণ গলা কাটা ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে, তবে স্পষ্ট নয়। অতঃপর শরীফ আর সিরাজ সাকোকে অতিক্রম করে আরো কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে নিঃশব্দে পানি হতে ডাঙ্গায় উঠল। ধীরে ধীরে ক্রলিং করে মানুষ দুটির পেছনে রাস্তার অপর পাড়ে এক ঝোপে গিয়ে লুকিয়ে তাদের কথোপকথন শুনতে চেষ্টা করল।

-পাক বাহিনী যেভাবে মার খাচ্ছে তাতে তো সন্দেহ নাই যে পাক বাহিনীর হার নিশ্চিত…

-তবে আমাদের সমস্যা নেই…

-ক্যান?মুক্তিযোদ্ধারা মনে হয় তোর মামা শ্বশুর হয় যে তোকে না মেরে ছেড়ে দিবে?

-আরে ব্যাটা যদি অবস্হা বেশি খারাপ হয় তবে মুক্তিদের সাথে যোগ দিব…

-অতো সোজা না! ধরতে পারলে খবর আছে! বুঝলি?

-আরে শালার পাকবাহিনীর নাকি পৃথিবীর শ্রষ্ঠ মিলিটারি, কিন্তু কাজের বেলায় তো কিছু দেখছি না! শুধু যুদ্ধ হারে আর মরে।

-শোন,সবসময় যদি অফিসাররা মদ আর মেয়ে মানুষ নিয়ে পরে থাকে তাহলে যুদ্ধ জিতবে কেমন করে?

-তা ঠিক! মনে হয় ও দেশের মেয়ে মানুষের স্বাদ কম! হাঃ হাঃ

-তা বলি কেমন করে? ও দেশেরটাতো চেখে দেখি নি…

ঝোপ থেকে বার হয়ে শরিফ আর সিরাজ আস্তে আস্তে তাদের কাছে যায় এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে। শরীর দুটি শরিফ এবং সিরাজের সাথে ধস্তাধস্তি করে নিথর নীরব হয়ে যায়। শরীফ আগুন জ্বেলে সংকেত দিতেই কমান্ডার বুঝতে পারে কাজ শেষ। সে আবার বাকি সদস্যসহ মেঠো রাস্তার কাছে এসে শরীফ সিরাজের সাথে মিলিত হয়। তারা আবার সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। একসময় তারা চলতে চলতে ধূপ খোলা মাঠে এসে পৌছায়।

পৌছানোর পর কমান্ডার শরীফ,পাচু,সিরাজসহ কাটুনবাহী দুইজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে পানিতে নেমে ট্রান্সফর্মারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে এবং অন্য ৪মুক্তিযোদ্ধাকে পাকা রাস্তার ঢালের ঝোপে ২জন করে বিপরীত মুখি হয়ে আশ্রয় নিতে বলে। যেন প্রয়োজনে তারা কাভারেজ দিতে পারে। যদিও এ দিকটা মুক্ত অঞ্চল বলা যায় তবুও পাক সেনাদের বড় বড় বহর আচমকা চলাচল করে রসদ নিয়ে। যদি কোন কারণে পাকসেনা ব্যাপার আঁচ করতে পারে তাহলে আক্রমণ করলে পাকা রাস্তার দিক হতেই করবে। যাই হোক যে যার অবস্হানে পৌছে যায়। কমান্ডার শরীফ,সিরাজ,পাচুকে বলে খুব ভালো করে এক্সপ্লোসিভ বেল্ট গুলো পিলারে জড়াতে বলে। মনোযোগ দিয়ে পিলারের ইস্পাতের এংগেলের সাথে এক্সপ্লোসিভ বেল্ট জড়াতে থাকে। এর মাঝে শো শো শব্দ তুলে পাকারাস্তা দিয়ে ভারী সাঁজোয়া যান এগিয়ে আসতে থাকে। ক্রমশ গাড়িগুলোর হেড লাইট স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হতে থাকে। পাকা রাস্তায় পজিশন নেওয়া যোদ্ধা ট্রিগারে হাত দিয়ে শুধু কমান্ডারের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু কমান্ডার ওদিকে পিলারের কাছের সবাইকে পানিতে নেমে ঠোঁট পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে বলে। ওদিকে পাকা রাস্তার পজিশন নেওয়া যোদ্ধারা অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে। কিন্তু কোন নির্দেশ আসে না। অবশেষে একে একে পার হয়ে যায় সাজোয়া যান মাত্র কয়েক হাত দূর দিয়ে। তারা কখনো এতগুলি শত্রুসেনা এক সাথে এত কাছে পায় নাই। কিন্তু কিছুই করতে পারল না শুধু কমান্ডার নির্দেশ না দেওয়ায়। যদিও বা সংখ্যায় তারা মাত্র চার জন। কিন্তু তাদের ছিল ৪টি মেশিনগান ৮টি গ্রেনেড। যা নিয়ে নিমিষেই এমবুশ করা সম্ভব ছিল। মনে মনে তারা কমান্ডারকে গালি দিতে শুরু করে।

সাঁযোয়া যান নিরাপদ দূরত্বে চলে যাবার পর আবার কমান্ডার সবাইকে কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়। এক্সপ্লোসিভ জড়ালো শেষ হলে কমান্ডার নিজ হাতে ফিউজটা সেট করে। সেটি প্রায় ৩ফুটের মত ঝুলে থাকে। তারপর কমান্ডার চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে শরীফকে ফিউজে আগুন ধরাতে বলে এবং অন্য সবাইকে দ্রুত তারা যে পথে এসেছিল সেদিক যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়। শরীফ ১ম চেষ্টায় ম্যাচ জ্বালাতে ব্যর্থ হলে কমান্ডার চাপা স্বরে ধমক দেয়। সে দ্বিতীয় চেষ্টায় সফল হয়। তারপর কমান্ডার শরীফকে নিয়ে অন্য সবার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ফিউজটার সময় ছিল এক মিনিট। শরীফ মনে মনে এক, দুই,তিন সময় গুণতে থাকে এবং সেই সাথে কমান্ডারের পেছনে পেছনে হাঁটু পানি দিয়ে ছুটতে থাকে। কমান্ডার আর শরীফ একসাথে, অন্য সবাই বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। কমান্ডার ৪৫সে পর অগ্রবর্তী সবাইকে থামতে বলে। তারা একসাথে জড়ো হয়, ১০সে পর কমান্ডার আর শরীফ তাদের সাথে যোগ দেয়। যোগ দিয়ে কমান্ডার সবাইকে পিলারের দিকে তাকাতে বলে। ততক্ষণে তারা নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছে।

কিছুক্ষণের মাঝেই বিকট শব্দ করে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের ধাতব সংঘর্ষের শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে যায়, রাতে নিঃস্তবদ্ধতা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়। আমন ক্ষেতের মাঝে কচুরিপানার উপর বাসা বানানো একজোড়া জল পিপি তাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়। বিশাল পিলারটি বিশালত্ব নিয়ে হাঁটু ভাঙ্গা মানুষের মত লুটিয়ে পড়তে থাকে। ট্রান্সফর্মারের দুই দিকে স্পাকিং হতে দেখা যায়। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই এক সাথে বলে ওঠে জয় বাংলা!!! তাদের এই জয় বাংলা স্লোগান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তারপর তারা বেশ খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর শুনতে পায় বিকট শব্দ। পেছনে ফিরে দেখে যে ট্রান্সফর্মারটি বিস্ফোরিত হয়ে জ্বলতে শুরু করছে। আর সেই আগুনের শিখার আলোকছটা ছড়াচ্ছে বহুদূর পর্যন্ত।

মুক্তিযোদ্ধারা বীরদর্পে এগিয়ে যেতে থাকে তাদের ক্যাম্পের দিকে।।

।..সমাপ্ত..।

একটি ‘মায়া’ কাহিনী

(উৎসর্গঃ যাদের জন্য বাংলাদেশ আজ স্বাধীন)

মায়া, তোমাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম একাত্তুরের কোন একটা ভরদুপুরে। তুমি হয়তো মনে করতে পারছ না। পুকুরঘাট থেকে মাত্র গোসল করে ফিরছিলে তুমি। চুল মুছতে মুছতে তুমি যখন আসছিলে, তখন মনে হচ্ছিল যেন সদ্য পাপড়ি ছড়িয়ে একটা পদ্য ফুল ফুটতে শুরু করেছে। বিশ্বাস করো, ৮ মাইল হেটে আসার ক্লান্তি আমার এক নিমিষেই দূর হয়ে গিয়েছিল। আমার গোঁফ দেখে তুমি তোমার বোন ছায়াকে বলছিলে, আমাকে নাকি খান-সেনাদের মত লাগে। রাগে আমার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল। কিন্তু একটি প্রস্ফুটিত পদ্যের মায়ামেশানো ভুবনভোলানো সরল হাসি আমার রাগটা পানি করে দিল। তোমার মায়াময়ী মুখটা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। সেদিনই মনে হয়েছিল তোমাকে আমার চাই-ই চাই। সেকথাটা মাকে বলেছিলাম লজ্জার মাথা খেয়ে। দেশে তখন সবে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মায়ের চাপে বাবা বাধ্য হয়ে তোমাদের বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। তুমি দাড়িয়ে ছিলে পুকুর পারে। আমাকে দেখেই ছায়াকে বললে,’দেখেছিস খান সেনাটা আমাদের বাড়িতেই আসছে’! মায়া তুমি হয়তো বুঝনি, তোমাকেই দেখতে আসছি। বড্ড ছেলেমানুষ ছিল তোমার মনটা। আমার সাথে এমন ভাবে কথা বলছিলে যেন কতদিনের পরিচিত আমি। তোমার এই শিশুসুলভ সরলতাই আমাকে বন্দি করেছে তোমার ভালবাসার মায়াজালে। গণ্ডগোলের এই পরিস্থিতিতে তোমার বাবা বিয়ের অনুষ্ঠান করতে রাজি হলেন না। পানচিনির পর ঠিক হল যুদ্ধ শেষ হলেই আমাদের বিয়ে হবে। শুরু হল তোমাকে নিয়ে আমার অপেক্ষা। বিধাতা বোধহয় আমার এই অপেক্ষা দেখে মুচকি হেসেছিলেন। রাতেরবেলা হানাদারেরা আমাদের গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিল। পুরো গ্রাম শ্মশান হয়ে গেল। আমি বৃদ্ধ বাবাকে ফেলে যেতে পারলাম না। ফজরের আজানের আগেই তোমার বাড়িতে গিয়ে কয়লা ছাড়া আর কিছু পেলাম না। তোমার পানচিনির শাড়িটার পোড়া আঁচল দেখে বুকটা আমার ছ্যাঁত করে উঠল। শোকের ষোলকলা পূর্ণ হল যখন শুনলাম তোমার মত একটা মেয়েকে গুলি করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে শুনে। আমি যেন একইসাথে বধির,কালা ও মূক হয়ে গেলাম। নিজের ভেতর কেমন যেন অদ্ভুত পরিবর্তন টের পেলাম। হানাদারদের প্রতি সত্যিকার ঘৃণা অনুভব করলাম। পরের দিন ভোরেই ভারতের আগরতলায় যুদ্ধ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগ দিলাম।দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করলাম। মাঝে মাঝে যুদ্ধ করতে করতে হতাশ হলেই তোমার কথা ভাবতাম। তখন মনে হতো তোমার জন্য হলেও ওই হানাদারদের হত্যা করতে হবে। ১৬ই ডিসেম্বরে বিজয় উল্লাসের মাঝেও মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে গেল। দেশের বিজয় হলেও আমার ভালবাসার তো বিজয় হল না। যুদ্ধের পরে ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। কিছুতেই মন বসতো না। প্রতিটা মুখের ভেতরে তোমার মুখ খুজে বেড়াতাম। ৭৩ এর রোজার ঈদটা আমার জীবনটা যে আবার ঘুরিয়ে দেবে তা আগে কখনও ভাবিনি। রেলস্টেশন থেকে গরুরগাড়িতে উঠতেই একজন বৃদ্ধের সাথের বোরকাওয়ালী মেয়ে একটা ঠিকানা লেখা কাগজ আমার গাড়োয়ানকে দিল। মেয়ের চেহারা নেকাপের জন্য দেখা যাচ্ছিল না। গাড়োয়ান লেখাপড়া না জানায় কাগজটা আমার দিকেই বাড়িয়ে দিল। মেয়েটা আমাকে দেখেই কেমন যেন চমকে গেল। কাগজে আমার বাড়ির ঠিকানা দেখে অবাক হলাম। তখন মেয়েটা চিৎকার করে বলল,’আপনি খানসাহেব না?’ তখনই বুঝতে পারলাম এ আর কেউ নয়,এ আমার মায়া। ওইদিন রাতে মায়াদের বাড়িতে আগুন দেবার আগেই ওরা ভারত চলে গিয়েছিল। যাবার পথে হানাদারদের গুলিতে মায়ার বোন ছায়া মারা যায়। ভারতে ওরা বনপারা শরণার্থী শিবিরে ছিল। দেশ স্বাধীন হবার ৪ মাস পর দেশে ফিরেছিল।

আমার বিয়ের ২৭ বছর হতে চলল। এখনও আমি যখন রেগে যাই, মায়া তখন সেই ভুবন-ভুলানো মোহিনী হাসি হেসে বলবে,’খান সাহেবের এতো রাগ কিসের?’ বিশ্বাস করুন আমার রাগ মুহূর্তেই পানি হয়ে যায়।
মায়া, তুমি পারবেনা আমার বাকি জীবনের বাকি রাগ,অভিমানগুলো এমনভাবে পানি করে দিতে?

(এটি একজন প্রথিতযশা মুক্তিযোদ্ধার কাহিনি, গ্রন্থনা ও অনুলেখনঃ মাহমুদ হাসান)

১০ই নভেম্বরের কালো রাত…

হালকা ঝাঁকিতে ঘুম ভাঙল আমার। তখন বাসটা ফেনি অতিক্রম করছিল। সেই ভোর চারটায় বাসে উঠেছি। উত্তেজনায় সারারাত ঘুম হয়নি, তাই বাসের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমি ঢাকা কলেজের ইতিহাস বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র। যাচ্ছি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নিভৃত এক পাড়াগাঁয়ে। সেখান থেকে লোহাপাড়া আমার খালার বাড়িতে। সাতকানিয়া উপজেলার সোনাপুর গ্রামে একটি সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল। আর সেই যুদ্ধের কিছু বাস্তব তথ্য নিতেই সেখানে যাওয়া। বলে রাখি,আমাদের কলেজ হতে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হবে আর এ সুবাদেই আমার চট্টগ্রাম যাওয়া। বাসটি খারাপ হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পৌছাতে পাড়লাম না। নিভৃত গ্রাম সোনাপুরে যখন পৌছালাম তখন বিকেল ৪টা বাজে। একেতো অচেনা জায়গা তার উপর আবার শীতকাল। গ্রামের সবাই প্রচন্ড ব্যস্ত তাদের আমন ধান ঘরে তোলার কাজে। অনেক চেষ্টা করেও কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারলাম না, কোন তথ্যই সংগ্রহ করতে পারলাম না। তাই আমাকে সেই দিনটি সোনাপুরেই থাকতে হল। বিকাল ৫টার দিকে জঙ্গলের ধারে এক রাস্তার বৃদ্ধা মহিলাকে দেখতে পেলাম, এগিয়ে গিয়ে আমার পরিচিতি দিয়ে সব কথা খুলে বললাম। কোনভাবেই বৃদ্ধা এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইল না। অনেক কষ্টে রাজি করালাম।

বৃদ্ধা বলল কি হবে এই সব দুঃখের কথা শুনে? বললাম যে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব কিছু কথা তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য। অনেক বুঝানোর পর তিনি রাজি হলেন। সবই পোড়া চোখে দেখেছি। কিভাবে ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়েছে ঐ নির্মম হানাদার বাহিনী। ইতিমধ্যে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। এখানে কেউ পরিচিত নেই জেনে আমাকে মহিলার বাড়িতে থাকতে বলল, আমি রাজি হয়ে গেলাম। মহিলাটি বলল, আমি অতি দরিদ্র তাই তোমার কষ্ট হবে। গ্রামের মসজিদ থেকে একটু দূরে একটি আধা ভাঙ্গা বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং তার যুবতি মেয়ে রহিমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন,আমি আর মেয়ে দুজনে এই বাড়িতে থাকি। রাতের খাওয়া শেষে অধির আগ্রহে বসে শুনতে লাগলাম ১০ নভেম্বর সোনাপুরের সেই সম্মুখ যুদ্ধের কথা। মহিলার বাড়িতে বিদ্যত্‍ না থাকায় ছোট্ট প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল। একটু একটু অন্ধকার পরিবেশ আর যুদ্ধের গল্প আমাকে নিয়ে গেল চল্লিশ বছর আগের সেই যুদ্ধের ঘটনাতে। মহিলাটি বর্ণনা দিতে লাগলেন..জানো বাবা, এখানে কতই না নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে ওরা। একটা শক্ত ঘাঁটি গেরেছিল গ্রামের পূর্ব প্রান্তে। গ্রামের দখল রক্ষা করতে আমাদের ছেলেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু তাদের পদে পদে বিপদ। গ্রামের কিছু রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে গিয়ে অত্যাচার করত। তারা বাড়ি যেতে পারত না, খেতে পারত না। তাই আমি ওদের গোপনে ভাত রান্না করে দিতাম এবং অস্ত্র লুকিয়ে রাখতাম। ওরা বলত আমাদের আর চারটা মেশিনগান ঐ কুত্তাদের রক্ত দিয়ে পা ধুইতাম। তারপর আসল সেই ১০ তারিখ। সেদিন সন্ধ্যায় পশ্চিমের জঙ্গল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছিল শত্রুর ঘাঁটির দিকে। ভয়ানক যুদ্ধ হল। আমি আর আমার মেয়ে রহিমা চকির নিচে পালিয়ে ছিলাম। কয়েকজন যোদ্ধা মারা গেল। একজন এর পেট এ গুলি লেগেছিল, সে আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। রাত দশটার দিকে আমার চোখের সামনে মারা গেল ছেলেটা। ঐ রাজাকাররা কতই না অত্যাচার করেছে গ্রামের সরল মানুষের উপর আর যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে পশুর মত আচরণ করেছে তাদের সাথে। আজো ওরা সমাজের বিভিন্ন স্হানে দাপটের সাথে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। সেই সমস্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পাবে, যেদিন যুদ্ধপরাধীদের বিচার হবে। একথা শেষ করতে না করতেই তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। রাত অনেক হয়েছে শুয়ে পড় বাবা, মহিলাটি আমাকে বললেন।

আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে সোনাপুরে আরো অনেকের সাথে কথা বলে খালার বাসা লোহাগড়ায় যাই। খালাকে মহিলার ব্যাপারে সব বললে তিনি আর্শ্চয্য হয়ে যান আর বলেন, বল কি? সেই মহিলার নামতো রাশিদা। ১০তারিখে মারা যান তিনি। হানাদাররা মহিলাকে গুলি করে মারে আর মেয়ে রহিমাকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানী ক্যাম্পে। আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কেঁপে ওঠে! বুঝতে পারলাম, সেই বৃদ্ধা মহিলা আর তার মেয়ের আত্মা আজো ঘুরে বেড়ায় সোনাপুরের আকাশে বাতাসে আর নতুন কাউকে খুঁজে পেলে তার কাছে দাবী জানায় কবে হবে যুদ্ধপরাধীদের বিচার??? তবেই শান্তি পাবে রাশিদা আর রহিমার মত শত শত শহীদের আত্মা। আর আমরা পার যুদ্ধপরাধী মুক্ত সোনার বাংলা।।

ভালবাসা

বেশ কিছুদিন আগের কথা। তখন সবে মাত্র HSC পাশ করলাম। রেজাল্ট বেশ ভালই হল। তাই বেশ ফুর ফুরে মেজাজেই ছিলাম। বাবা মোবাইল কিনে দিলেন। সেটা নিয়ে যে কত খুশি ছিলাম বোঝাতে পারব না। প্রতিদিনই আমার বন্ধুদের ফোন করতাম। আমার বন্ধুরা ও আমাকে ফোন করত।
একদিন অজানা একটা নাম্বার থেকে আমার ফোন এ কল এল। আমি ধরলাম, বললাম, “কে বলছেন?” উত্তর, “জী, মিতা আছে?” আমি বললাম, “না, এখানে মিতা বলে কেউ নেই। আপনি কে বলছেন?” উত্তর, “সরি, রং নাম্বার।”
ফোন এ মেয়ে কণ্ঠ শুনে আমি অভ্যস্ত নই। তাই বেশ নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। ওইদিন ওইটুকুই কথা হল।
পরের দিন কেন জানি ওই নাম্বার টাতে আমি ফোন করে বসলাম। কিন্তু আমি সে রকম ছেলে নই যে ফোন করে মেয়ে দের ডিস্টার্ব করব। জানি না কেন জানি ফোন টা করেই দিলাম। তো, কল গেল। ওপর পাশ থেকে একটা মেয়ে কণ্ঠ শুনলাম। “”হেলো, কে বলছেন?”” আমি কি বলব কিছু না বুঝতে পেরে বললাম, ওই যে কাল আপনি রং নাম্বার এ কল করলেন, আমি সে। উত্তর এল, “জী বলেন।” আমি বললাম, জী থ্যাংক ইউ।
এ কথা বলেই ফোন টা রেখে দিলাম। আমার জীবনে ও এতটা নার্ভাস লাগে নি যত টা না তখন লাগছিল।

জানি না কেন আমার খুব খুশি খুশি লাগছিল। এ কথা ভেবে আমি সারা রাত ঘুমাতেই পারি নি। খুব সকালে একটু ঘুম এল। আর ঘুম ভাঙল একটা ফোন পেয়ে। সেই নাম্বার!!! তখন সকাল ৭ টা। আমি যথা সম্ভব ঘুম জড়ানো কণ্ঠ কাটিয়ে বললাম,
হ্যালো……, কে বলছেন?
জী, কাল কে আপনি যাকে ফোন করেছিলেন, আমি সে।
ওহ, জী বলুন…।
ব্যাস, ফোন টা কেটে দিল। বুঝলাম না কেন… তবে আমি যে মনে মনে খুব খুশি হয়ে আছি, সেটা খুব ভালো মতই টের পেলাম।
বেশ কয়েক ঘণ্টা এভাবেই কেটে গেল। আমি আমার ফোন দিয়ে ওই মেয়েটার নাম্বার এ sms করলাম,
Hi, I am Rizu, You?
উত্তর এল, I am Anika… Thanks…
ওই দিন এ পর্যন্তই। পরের দিন আমি ওকে ফোন করলাম, বললাম, কেমন আছেন?
উত্তর… জী ভালো, আপনি কেমন আছেন?
আমি ও বললাম ভালো।
এভাবে সৌজন্যমুলক কথা বললাম প্রায় ৫ মিনিট। মেয়ে টি কে জিজ্ঞেস করলাম ওর ঠিকানা, বাড়ি, মা বাবার কথা সবকিছু। আশ্চর্য জনক ভাবে মেয়ে টি ও আমাকে বলে দেয় সবকিছু। আমি ও বলি…
এর পরের দুই দিন কথা হয় নি। পরের দিন মেয়ে টি মানে আনিকাই আমায় ফোন করে। ভালো মন্দ কথা বলি, পড়ালেখার কথা বলি etc etc….
বলা হয় নি, ওর বাড়ি আর আমার বাড়ির দূরত্ব বেশি ছিল না, দুই তিন কিলোমিটার হবে…। তো, এভাবেই চলতে থাকে। সপ্তাহে দুই তিন বার কথা হতো। বেশ ভাল বন্ধু হয়ে যাই আমরা, আপনি থেকে তুমি হয়ে যাই আমরা।
একদিন আনিকা কে বললাম, তোমাকে তো কখনো দেখি নি, চল একবার দেখা করি..।। ও রাজি হল। আমরা দুই দিন পরই দেখা করলাম…দেখা করা মানে, ও পার্ক এ এসেছিল, আমি ও গিয়েছিলাম। ফোন এ কথা বলে বলে পার্ক এ চিনতে পারলাম ওকে, তাছাড়া ও বলেছিল লাল কিছু একটা পরে আসবে। ওকে দেখলাম, কিন্তু কথা বলি নি। ও ওর ছোট বোন কে নিয়ে এসেছিল।
ওকে দেখার পর আমার মনে হল, আমি আমার জীবনের সেরা সুন্দরী মেয়ে কে দেখছি। মনে অদ্ভুত এক ইচ্ছা পেয়ে বসল। মনে হল, ওকে ভালোবেসে ফেলেছি…। এভাবে কোন দিন কারো প্রেম এ পড়ব ভাবিনি। ওর কণ্ঠ টা ছিল খুব মিষ্টি, তাই হয় তো ওর সাথে কথা বলে ভালো লাগত। কিন্তু তখন বুঝিনি ওকে প্রথম দেখাতেই ভালবেসে ফেলব।
বাসায় আসার পর ওকে ফোন করে বললাম, আনিকা জানো, তুমি খুব সুন্দরী, আমার দেখা সেরা সুন্দরী। আনিকা বলল, আহহা রে, তার দেখা সেরা সুন্দরী… কত জন কে দেখেছ, হে??????
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, অনেক মেয়ে কেই দেখেছি। কোন দিন কারো সাথে কথা বলি নি, বা চোখ তুলে তাকাই নি, দেখতে হয়েছে বলেই দেখেছি!!!!

ওই পর্যন্ত ই কথা হল……।। তো , এভাবেই চলতে থাকল। আমি তখন ও বলতে পারি নি যে ওকে ভালবাসি।
কিন্তু আমার আর তর সইল না, একদিন ফোন করে বললাম, I love You…
ও হয় তো কিছুটা অবাক হয়েছিল। বলল, দাড়াও, আমায় কিছু দিন সময় দাও। আমি ভেবে দেখি…
আমার ভাগ্য টা কে ভালো ই বলতে হবে!!! পরের দিন ই ও ফোন করে বলল, Love you too!!!!!

তখন কেমন ফীলিংস হয়েছিল বোঝাতে পারব না… আপনারাই ভেবে নিন…। তবে নিজেকে আমার পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ ই মনে হচ্ছিল।

তখন থেকেই আমাদের প্রেমের শুরু। প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে যেটা হয়, ফোন এ কথা বলা…।। সেটা তখন নিয়মিতই হতো… মাঝে মাঝে দেখা করতাম, তবে কখনই ও একা আসেনি, ওর ছোটবোন কে নিয়ে আসতো। তাই সামনাসামনি কথা খুব কমই হতো… আমরা দুজন দুজন কে খুব বেশিই ভালো বেসে ফেলি…
ও একদিন আমায় ফোন করে খুশিতে ফেটে গিয়ে বলল, জানো, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!!!
আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, শুধু বললাম, মানে???
ও বলল, বর টা কে জানো???
আমি বললাম, কে?
উত্তর…।। তুমি…………!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!
আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, শুধু বললাম, মানে? কিভাবে সম্ভব???
ও যা বলল, তার সারমর্ম…

ওকে ওর বাসা থেকে বিয়ের কথা বলে। ও তেমন সায় দেয় না……..কিন্তু যখন পাত্রের বিবরন শুনে তখন কেমন যেন মনে হয়… পরে ছবি দেখে!! আনিকা সাথে সাথেই বলে দেয় যে ও রাজি!! এর কিছুদিন পর আমাকেও বাসায় মা/বাবা বিয়ের পাত্রীর কথা বলে… আমি সবই জানি… কিন্তু এমন ভাব করি যেন ধোয়া তুলসি পাতা… বলি তোমাদের ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা… 😉

তার পর আর কি…। আপনারাই বুঝে নিন আমার মনের অবস্থাটা…।। ওর সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে… আমি ব্যারিস্টারি পাশ করার পরই ওর সাথে আমার বিয়ে হবে।। সেই সাথে আমাদের প্রেম ও চলছে পুরদম এ!!! কিন্তু আমাদের পরিবারের কেউ ই জানে না আমাদের প্রেমের কথা!!!!!!

সিনেমায়ও বোধয় প্রেমের এত সহজ সমীকরণ হয় না…। আল্লাহ মনে হয় আমার ওপর খুশি, তাই আমার জীবনের এত বড় ইচ্ছাটাকে তিনি এত সহজেই আমার করে দিলেন…।। আপনারা সবাই আমার আর আনিকার জন্য দুয়া করবেন প্লিজ……।।
________________________ooo______________________

ভালবাসার অনুরণন

মন ছুঁয়ে যায় এমন কিছু না, মনটাকে হয়তো একটু দোলা দিয়ে যেতে পারে এমনি একটা কাহিনী বলব আজ। মেডিকেল কোচিং করতে এসে শুক্রাবাদের একটা বাসায় উঠেছিলাম। সেই সুবাদে বাড়িওয়ালার ছেলে জাহিদভাইয়ের সাথে পরিচয়। দেখতে সাধারন কিন্তু অসাধারন মানসিকতার এই মানুষটিরই গল্প বলব। জাহিদভাইয়ের সাথে পরিচয়ের সুত্র ধরেই ওনার ভাললাগার মানুষ সানজু আপুর সাথে আমার পরিচয়। গল্পটার কিছুটা অংশ ওনাদের মুখেই শোনা যাক।

সানজুআপুর কথা —
সানজিদা ইসলাম। সবাই আমাকে সানজু নামেই চেনে। বাবা আমাকে আদর করে এই নামেই ডাকতো। ছোটবেলা থেকে আমার বাবাই ছিল আমার পৃথিবী। বাবাকে আমি প্রচণ্ড ভালবাসতাম। পরহেজগারি বাবা এক কথার মানুষ ছিলেন। যা বলবেন তাই করতেন। আপনারা ভাবছেন বাবার এতো গল্প করছি কেন? কারণ পরমপূজনীয় বাবা আমার ২২ বছরের জীবনে ঝড় বইয়ে তছনছ করে দিয়েছিলেন।
ধানমণ্ডি লেক ঘেঁষেই আমাদের বাসাটা। বিকেলবেলায় কফি হাতে লেক-অভিমুখি জানালা দিয়ে বাইরের জগতটাকে দেখা আমার বহু পুরনো অভ্যাস। একটা লম্বাচুলো সদ্যজাগ্রত দাড়ির ছেলেকে প্রায়ই দেখতাম আমাদের বাসার কাছেই মাছ ধরত। সিগারেট মুখে হেঁড়ে গলার ইংলিশ গান গাওয়া ছেলেটাকে দেখলেই আমার গাটা ঘৃণায় রি রি করত। আস্তে আস্তে সেটাও কেমন চোখ সইয়ে গেল। কেমন যেন একটা ভাল লাগা অনুভুতি তৈরি হল। অনেক কষ্টের পর ছেলেটা যখন একটা মাছ পেত তখন আমার কিযে খুশি লাগতো তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। ওর থেকে মনে হয় আমিই বেশি খুশি হতাম। ভালই কাটছিল দিনগুলো। হঠাত একদিন দেখি ছেলেটা নেই। আমার অস্থিরতা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। ১৫দিন পার হয়ে গেল, আমার মনের খচখচানি কিছুতেই দূর হচ্ছে না। নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হচ্ছিলাম, একটা চেংড়া ছেলের জন্য আমি কেনো অস্থির হচ্ছি। প্রতিটা বিকাল আমার চোখ শুধু ছেলেটাকেই খুজে বেড়াতো। দীর্ঘ ২২ দিন পর এক বৃষ্টিস্নাত বিকালে ওকে ছাতা মাথায় মাছ ধরতে দেখে আমার চোখের বৃষ্টি আটকাতে পারলাম না। মনটা কেমন অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল। ওইদিনই ঠিক করলাম ওকে কাছ থেকে দেখবো। তারিখটা আজও মনে আছে। ৩রা জুন ২০০৬,খুব ভাল করে না দেখলে ছেলেটাকে বখাটে মনে হবারই কথা। তার চোখ কিন্তু অন্য কথা বলে। কিছুটা মায়া কিছুটা লজ্জা মিশানো চোখ দুটিতে তাকিয়ে চোখের পলক ফেলতে যেন ভুলেই গিয়েছিলাম। বেচারা লজ্জা পেয়ে নিজেই চোখ নামিয়ে নিল। বিশ্বাস করুন প্রতিটা বিকালে শুধুমাত্র ওইদুটি চোখ দেখার জন্য পাগলের মত ওখানে ছুটে যেতাম। বেচারা প্রতিবারই লজ্জায় কুঁচকে যেতো। মাঝে মাঝে মনে হতো ও যেন কিছু একটা বলতে চাচ্ছে।
এরপরই ঘটল আসল ক্লাইম্যাক্স। আমার নামে প্রায়ই কাজিনদের পাঠানো কুরিয়ার আসতো। একদিন কুরিয়ার রিসিভ করে ডেলিভারিম্যান এর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ও যে কুরিয়ার নিয়ে আসবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি। রিসিট উল্টে দেখি লেখা ,জাহিদ-০১৭১৭৬৪৬৩…ততক্ষনে সে হাওয়া। নয়-নয়টা দিন নিজের সাথে যুদ্ধ করে নিজেই হেরে গেলাম। একবিকালে ওই জানালায় দাড়িয়ে ওকে ফোন দিলাম। আমার ফোন ধরে যেই বুঝল আমি ফোন করেছি, তখনি ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের জানালার দিকে তাকাল। সে যেন জানত আমি ওখানেই দাড়িয়ে আছি। এরপর থেকে প্রতি বিকালেই জানালায় দাড়িয়ে মোবাইলে তার সাথে কথা বলতাম। একটা মাছ পেলেই আর কথা নেই,আমাকে দেখানো চাইই চাই। ওর শিশুসুলভ মনটাই আমাকে বেশি টানত।

ভালোয় ভালোয় দেড় বছর পার হল। বাসার সবাই আমার প্রেমের কথা জেনে গেল। যে বাবা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু, সেই বাবাই আমার জীবনটাকে চুরমার করে দিলেন। বাবার একটাই কথা তিনি প্রেমের বিয়ে মানবেন না। তাই ছেলেকে দেখার প্রয়োজনও বোধ করলেন না। অথচ এই বাবা জীবনে আমার কোন আবদার ফেলেন নাই। আমার পছন্দটাকে বাবা কোন গুরুত্বই দিলেন না। বুয়েট পাশ জাহিদের কি কম যোগ্যতা ছিল? বাবা যেরকম মানুষ তাতে তিনি কখনোই এই বিয়ে মানবেন না। একবার ভাবলাম পালিয়ে বিয়ে করি কিন্তু জাহিদ রাজি হল না। তার কথা, মানুষ বিয়ে করে সুখী হবার জন্য, কিন্তু এভাবে বিয়ে করে কখনো সুখী হওয়া সম্ভব না। এখন ভাবি, এমন বাবার মেয়ে হয়ে কেন প্রেম করতে গেলাম। আপনারাই বলুন প্রেম ভালোবাসা কি যুক্তির উরধে নয়? আমি যেন জিন্দালাশ হয়ে গেলাম। এখনো আমার দুটো বিকাল কাটে লেকের মাছ ধরা দেখে। শুধু আমার চোখ খুজে বেড়ায় সেই লজ্জা ও মায়া মেশানো চোখ দুটো কে………

জাহিদ ভাই এর কথা…

সানজু যে প্রতিটা বিকালে জানালা দিয়ে আমাকে দেখত তা কখনো টের পাইনি। টাইফয়েডের জন্য তিন সপ্তাহ পর যেদিন ফিরলাম, সেইদিনই দেখলাম একটি মেয়ে অপলক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । কেমন যেন অদ্ভুত ভাললাগায় মনটা ভরে গেল। এরপর প্রতিদিনই মেয়েটাকে হাঁটতে দেখতাম। প্রতিদিনই ভাবতাম ওর সাথে কথা বলব, কিন্তু সাহসে কুলাতো না। একদিন মরিয়া হয়ে কন্টিনেন্টাল কুরিয়ারের মজিদ ভাইকে ১০০ টাকা ঘুষ দিয়ে সানজুর কুরিয়ারটা দিতে গেলাম। ওকে এবারও কিছু বলতে পারলাম না। কোনমতে মোবাইল নম্বর দিয়ে পালিয়ে এলাম। এরপরের একটা সপ্তাহ যেন জাহান্নামে কাটালাম। মোবাইল এর প্রতিটা কল এলেই চমকে উঠতাম, এই বুঝি সানজুর কল এল। ৯ দিন পর এক বিকালে ওর কল পেলাম। এরপর আর কি বলব, বলা যায় স্বর্গীয় দেড় বছর কাটালাম। কিন্তু আমাকে চুরমার করে দিলেন সানজুর বাবা। একরোখা মানুষটা আমাদের স্বর্গীয় প্রেমকে নিজ হাতে গলা টিপে মারলেন। সানজু বলেছিল পালিয়ে বিয়ে করতে কিন্তু আমি রাজি হইনি। অযথা দুঃখ বাড়িয়ে লাভ কি। তাছাড়া এরকম বিয়েতে আমার পরিবারও রাজি ছিল না। এখনও মাছ ধরি তবে সানজুর বাসার কাছে না। মাঝে মাঝে গভীর রাতে সানজুর বাসার সামনে দাড়িয়ে আমার ভালবাসার মানুষের মুখটা কল্পনা করি। কল্পনা করে বুঝতে চেষ্টা করি ভালবাসার মানুষটা কেমন আছে…

আমার কথা..
এই কথাগুলো ২০০৮ এর আগের। জাহিদভাই এখন একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের CEO হিসাবে আছেন। তার জন্য বিয়ের পাত্রী খোজার দায়িত্ব পড়ল আমাদের উপর। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারির কোন একটা বিকালে জাহিদভাই আমাকে আর রাতুলকে ডেকে বললেন আজ ওনাকে পাত্রীপক্ষ অফিসেই দেখতে আসবে। বিকালে পাত্রিপক্ষের যে মুরুব্বী আসলেন তাকে দেখার জন্য জাহিদভাই প্রস্তুত ছিলেন না। স্বয়ং সানজু আপুর বাবা!!! সম্ভবত উনি জাহিদভাইকে আগে দেখেননি, আর দেখলেও চুল ছেঁটে ফেলায় জাহিদভাইকে চেনেন নাই। সবদিক বিবেচনা করলে জাহিদভাই এখন সত্যিকার যোগ্য পাত্র। উনি জাহিদভাইকে পছন্দ করলেন। আসলে এটা ছিল আমার আর রাতুলের প্ল্যান। জাহিদভাই অবশ্য কিছুই জানতেন না। সবচেয়ে মজা হল যেদিন জাহিদভাই পাত্রি দেখতে গেল। আমি অবশ্য সানজুআপুকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম, যাতে কোন ঝামেলা না হয়। বিশ্বাস করুন বিয়ের আগ পর্যন্ত আমরা চরম টেনশনে ছিলাম, কখন কি হয়ে যায়। বিষয়টা গাঁজাখুরি মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি। ২০১০ সালের ১৯মার্চের রাতে আমাদের সব টেনশন নিভিয়ে দিয়ে একটি শ্বেতসুভ্র ভালবাসা বিয়েতে রুপ নিল।

শেষ কথা…
এখনো ধানমণ্ডির জাহাজবাড়ির সামনে হাঁটতে গেলে প্রায়ই জাহিদভাই ও সানজুআপুকে পা ঝুলিয়ে লেকের পারে বসে থাকতে দেখা যায়। দেখলেই মনে হবে এরা যেন একে অপরের জন্য সৃষ্টি। অদ্ভুত ভাললাগায় মনটা ভরে যাবে আপনার। তখন মনে হবে ভালবাসা আসলেই মহান….. ভালবাসা আসলেই পবিত্র…

(এই দম্পতির জন্য আপনারা ভাল করে দোয়া করবেন।কারন তারা আগামী ২০শে ডিসেম্বর একজন রাজপুত্রকে এই দুনিয়ায় আনতে যাচ্ছে। রাজপুত্রের নাম ঠিক করার দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের !!!!)