১০ই নভেম্বরের কালো রাত…

হালকা ঝাঁকিতে ঘুম ভাঙল আমার। তখন বাসটা ফেনি অতিক্রম করছিল। সেই ভোর চারটায় বাসে উঠেছি। উত্তেজনায় সারারাত ঘুম হয়নি, তাই বাসের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমি ঢাকা কলেজের ইতিহাস বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র। যাচ্ছি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নিভৃত এক পাড়াগাঁয়ে। সেখান থেকে লোহাপাড়া আমার খালার বাড়িতে। সাতকানিয়া উপজেলার সোনাপুর গ্রামে একটি সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল। আর সেই যুদ্ধের কিছু বাস্তব তথ্য নিতেই সেখানে যাওয়া। বলে রাখি,আমাদের কলেজ হতে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হবে আর এ সুবাদেই আমার চট্টগ্রাম যাওয়া। বাসটি খারাপ হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পৌছাতে পাড়লাম না। নিভৃত গ্রাম সোনাপুরে যখন পৌছালাম তখন বিকেল ৪টা বাজে। একেতো অচেনা জায়গা তার উপর আবার শীতকাল। গ্রামের সবাই প্রচন্ড ব্যস্ত তাদের আমন ধান ঘরে তোলার কাজে। অনেক চেষ্টা করেও কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারলাম না, কোন তথ্যই সংগ্রহ করতে পারলাম না। তাই আমাকে সেই দিনটি সোনাপুরেই থাকতে হল। বিকাল ৫টার দিকে জঙ্গলের ধারে এক রাস্তার বৃদ্ধা মহিলাকে দেখতে পেলাম, এগিয়ে গিয়ে আমার পরিচিতি দিয়ে সব কথা খুলে বললাম। কোনভাবেই বৃদ্ধা এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইল না। অনেক কষ্টে রাজি করালাম।

বৃদ্ধা বলল কি হবে এই সব দুঃখের কথা শুনে? বললাম যে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব কিছু কথা তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য। অনেক বুঝানোর পর তিনি রাজি হলেন। সবই পোড়া চোখে দেখেছি। কিভাবে ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়েছে ঐ নির্মম হানাদার বাহিনী। ইতিমধ্যে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। এখানে কেউ পরিচিত নেই জেনে আমাকে মহিলার বাড়িতে থাকতে বলল, আমি রাজি হয়ে গেলাম। মহিলাটি বলল, আমি অতি দরিদ্র তাই তোমার কষ্ট হবে। গ্রামের মসজিদ থেকে একটু দূরে একটি আধা ভাঙ্গা বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং তার যুবতি মেয়ে রহিমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন,আমি আর মেয়ে দুজনে এই বাড়িতে থাকি। রাতের খাওয়া শেষে অধির আগ্রহে বসে শুনতে লাগলাম ১০ নভেম্বর সোনাপুরের সেই সম্মুখ যুদ্ধের কথা। মহিলার বাড়িতে বিদ্যত্‍ না থাকায় ছোট্ট প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল। একটু একটু অন্ধকার পরিবেশ আর যুদ্ধের গল্প আমাকে নিয়ে গেল চল্লিশ বছর আগের সেই যুদ্ধের ঘটনাতে। মহিলাটি বর্ণনা দিতে লাগলেন..জানো বাবা, এখানে কতই না নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে ওরা। একটা শক্ত ঘাঁটি গেরেছিল গ্রামের পূর্ব প্রান্তে। গ্রামের দখল রক্ষা করতে আমাদের ছেলেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু তাদের পদে পদে বিপদ। গ্রামের কিছু রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে গিয়ে অত্যাচার করত। তারা বাড়ি যেতে পারত না, খেতে পারত না। তাই আমি ওদের গোপনে ভাত রান্না করে দিতাম এবং অস্ত্র লুকিয়ে রাখতাম। ওরা বলত আমাদের আর চারটা মেশিনগান ঐ কুত্তাদের রক্ত দিয়ে পা ধুইতাম। তারপর আসল সেই ১০ তারিখ। সেদিন সন্ধ্যায় পশ্চিমের জঙ্গল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছিল শত্রুর ঘাঁটির দিকে। ভয়ানক যুদ্ধ হল। আমি আর আমার মেয়ে রহিমা চকির নিচে পালিয়ে ছিলাম। কয়েকজন যোদ্ধা মারা গেল। একজন এর পেট এ গুলি লেগেছিল, সে আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। রাত দশটার দিকে আমার চোখের সামনে মারা গেল ছেলেটা। ঐ রাজাকাররা কতই না অত্যাচার করেছে গ্রামের সরল মানুষের উপর আর যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে পশুর মত আচরণ করেছে তাদের সাথে। আজো ওরা সমাজের বিভিন্ন স্হানে দাপটের সাথে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। সেই সমস্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পাবে, যেদিন যুদ্ধপরাধীদের বিচার হবে। একথা শেষ করতে না করতেই তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। রাত অনেক হয়েছে শুয়ে পড় বাবা, মহিলাটি আমাকে বললেন।

আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে সোনাপুরে আরো অনেকের সাথে কথা বলে খালার বাসা লোহাগড়ায় যাই। খালাকে মহিলার ব্যাপারে সব বললে তিনি আর্শ্চয্য হয়ে যান আর বলেন, বল কি? সেই মহিলার নামতো রাশিদা। ১০তারিখে মারা যান তিনি। হানাদাররা মহিলাকে গুলি করে মারে আর মেয়ে রহিমাকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানী ক্যাম্পে। আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কেঁপে ওঠে! বুঝতে পারলাম, সেই বৃদ্ধা মহিলা আর তার মেয়ের আত্মা আজো ঘুরে বেড়ায় সোনাপুরের আকাশে বাতাসে আর নতুন কাউকে খুঁজে পেলে তার কাছে দাবী জানায় কবে হবে যুদ্ধপরাধীদের বিচার??? তবেই শান্তি পাবে রাশিদা আর রহিমার মত শত শত শহীদের আত্মা। আর আমরা পার যুদ্ধপরাধী মুক্ত সোনার বাংলা।।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: