সম্পূর্ণ সত্যি ঘটনা। এমন ঘটনা এখন পাওয়া দুর্লভ।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়। শরতের আকাশ সাদা সাদা, ঈষত্‍ ধূসর ছাইরাঙা মেঘগুলি গোল্লাছুট খেলে, দুরন্ত শিশুর মত। আর মেঘের এই দুরন্ত দস্যিপনার কাছে দুপুরের তপ্ত সূর্য মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়। এমনই এক আধো বাদলা আধো রোদেলা দিনে হাটিম কূল মুক্তিযোদ্ধাদের বেইজ ক্যাম্পে এক ভিখারী প্রবেশ করে। গায়ের পোষাকটা বেশ চটকদার। রংবেরঙের তালি মারা জীর্ণ আলখেল্লা, হাতে লাঠি, লম্বা শ্বেত, শূভ্র দাঁড়ি-চুল। শরিফ ফকিরটির গতিরোধ করে বলে, “তুমি কে?”

ফকির, “আমি গণি, মুক্তিযোদ্ধা, জয় বাংলার লোক।”

শরিফঃ কাকে চাই?

গণি ফকিরঃ কমান্ডারের কাছে যাব।

শরিফঃ কেন?

গণি ফকিরঃ সেক্টর কমান্ডার পাঠিয়েছেন,গোপন কথা আছে।

শরিফঃ পাস কোড বল।

গণি ফকিরঃ পাতি হাঁস।

শরিফঃ ঠিক আছে, চলো।

শরিফ আর গণি ফকির ধীরে ধীরে আধা পাকা স্কুল ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে শরিফ স্যালুট দেয়। দেখতে পায় কমান্ডার মানচিত্রের দিকে নিবিষ্ট মনে কুচকানোভু নিয়ে তাকিয়ে আছে। হাতে পেন্সিল, স্কেল আর কম্পাস দিয়ে কিসের যেন মাপজোক করছে। শরিফকে দেখে বলে, “আরে শরিফ বসো, বলো কি জন্যে এসেছ?” শরিফ কমান্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় কয়েক রাত না ঘুমানো এক জোড়া লাল রক্ত চক্ষু।

শরিফঃ কমান্ডার এক অগন্তুক আপনার সাথে কথা বলতে চায়!

কমান্ডারঃ ভেতরে আসতে বল।

শরিফ গণি ফকিরকে ভেতরে আসতে বলে। গণি ফকির এসে স্যালুট দিয়ে বলে, “কমান্ডার সেক্টর কমান্ডার আপনাকে একটি পত্র পাঠিয়েছেন, এই নিন।” —বলে কমান্ডারের কোমরে থাকা একখানি কাগজ এগিয়ে দেয়।

কমান্ডার দেখতে পায় সেক্টর কমান্ডারের নিজ হাতে লেখা ও সাক্ষরিত একটি চিঠি। যাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ধূপখোলা গ্রামের পশ্চিমে যে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার আছে তা বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে। যথা সময়ে এক্সপ্লোসিভ আমুনিশন কমান্ডারের নিকট পৌছে যাবে। কমান্ডার বুঝতে পারে এই ৪০০০ কিলোভোল্ট লাইনের মাধ্যমেই শহরে বিদ্যত্‍ সরবরাহ করা হয়। যদি এটি ধ্বংস করা যায় তাহলে সমস্ত শহর রাতের আঁধারে ভুতুরে নগরীতে পরিণত হবে। এতে করে অপারেশন চালানো বেশ সহজ হবে। খুব সহজেই পাক বাহিনীকে কোণ ঠাসা করা যাবে। হযত এই বৈদ্যুতিক লাইন বিকল করার মাধ্যমেই সেক্টর কমান্ডার বড় ধরণের যুদ্ধ শুরু করতে চাচ্ছেন। যাই হোক এমন একটা নির্দেশ পেয়ে কমান্ডার বেশ উত্‍ফুল্ল মেজাজে কাজ শুরু করে। সে শরিফ, পাচু, সামাদ, সিরাজ, বরকতসহ আরো কিছু চৌকশ তরুণ যোদ্ধাদের নিয়ে একটা বিশেষ দল গঠন করে।

সবাই গোপন বৈঠকে বসে। কমান্ডার সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশ সবাইকে জানায় এবং তাদের প্রস্তুত হতে বলে। সে তাদের জানায় যে এটি একটি বড় যুদ্ধ শুরুর আলামত সবাইকে মানসিক প্রস্তুতি নিতে বলে। একথা শুনে শরিফ প্রস্তাব করে যে তারা কয়েকজন শহরের দিকে এগিয়ে গিয়ে রোজ গভীর রাতে শহরের দিকে তাক করে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়বে। পাল্টা ওরা নিশ্চয় অনেক গুলি ছুড়বে, এতে করে তাদের গুলির মজুদ কিছুটা হলেও কমবে। কমান্ডার জানায় যে আজ রাতেই পরীক্ষমূলকভাবে করতে। যদি ভালো কাজ হয় তবে রোজ তা করা হবে। কমান্ডারের নির্দেশ পেয়ে শরিফ আর পাচু সে রাতেই শহরের দিকে ৩ কি.মি পথ পায়ে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে ফাঁকা ফায়ার করল। একজন শহরের পূবদিক বরাবর অন্যজন পশ্চিমদিক বরাবর। ব্যাস যে কথা সেই কাজ। পাক বাহিনী পাল্টা জবাবে ছুড়ল হাজার রাউন্ড গুলি। আবার সেই রাতে শরিফ আর পাচু দেখতে পায় আকাশে অসংখ্য তপ্ত শিশার আলোক ছটা। বেশি পরিমাণে ফাঁকা গুলি বর্ষণ করলো যে কানে তালা লাগায় উপক্রম। নিস্তব্ধ কালো অন্ধকারকে ভেদ করে সেই শব্দ পৌছে গেল শহর থেকে ৫কিমি দূরের হাটিম কূল বেইজ ক্যাম্পে। কমান্ডারের মুখে তৃপ্তির হাসি। ২ঘন্টা পর দুই বীরযোদ্ধা শরীফ আর পাচু ফেরত আসে।

পরেরদিন ভোরবেলায় জেলের ছদ্মবেশে কমান্ডার শরীফ আর পাচুকে পাঠায় ধূপখোলা ট্রান্সফর্মার সরেজমিনে দেখে আসার জন্য। তারা সারাদিন পায়ে হেঁটে ৪ঘন্টা পর পৌছে ১০কিমি দূরের ধূপখোলা ট্রান্সফর্মারের কাছে। সেখানে দেখতে পায় চারদিকে ১কিমি মধ্যে কোন বাড়ি নেই। শুধু থৈ থৈ হাঁটু পানি, আমনের ক্ষেত। ২০০ গজ দূরে একদিকে পাকা রাস্তা, দুইদিকে গাঁয়ের মেঠো রাস্তা, ১কিমি দূরে গ্রাম। মাঝে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় বৈদ্যুতিক খুঁটি। তারি মাঝে একটি খুঁটিতে ট্রান্সফর্মারটা বসানো। ফেরার পথে তারা বেশ কিছু মাছ ধরে আনে। বেশ কয়েকদিন পর ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা রাতের খাবারে ডাল ভাতের সাথে মাছের ঝোল পেয়ে বেশ খুশি। তিনদিন পর দুপুর বেলা ক্যাম্পের সামনে একটি গরুর গাড়ি এসে থামে, যার উপর বেশ কয়েকটি গুড়ের পাত্র। চালক নেমে প্রহরারত মুক্তিযোদ্ধাকে বলে কমান্ডারকে ডেকে দিতে। কমান্ডার আসলে তার হাতে একটি পত্র দেওয়া হয়। পত্রটিতে নির্দেশ আছে, “আজ রাতেই অপারশন করতে হবে,পর্যাপ্ত এক্সপ্লোসিভ দেওয়া হল।” অতঃপর কমান্ডার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে গুড়ের পাত্রগুলো নামিয়ে নিতে বলে।

প্রকৃতপক্ষে ঐ গুড়ের মাঝেই সংরক্ষিত অবস্হায় লুকানো ছিল আমুনিশন ও এক্সপ্লোসিভ। রাত দশটার দিকে কমান্ডার ,শরীফ,পাচু, সিরাজসহ ১০ মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গেল ধূপখোলা মাঠের দিকে। সবার কাছে একটি করে হালকা মেশিন গান,পর্যাপ্ত গুলি কোমরে বাঁধা। দুইজন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দুই কার্টুন ভরা এক্সপ্লোসিভ। সবার সামনে কমান্ডার, তার পিছনে শরিফ, তারপর পাচু তার অন্যান্যরা। পিপীলিকার দলের মত তারা বেশ খানিকটা দুরত্ব রেখে লাইন ধরে পাকা রাস্তা হবে বেশ দূর দিয়ে ধান ক্ষেতের আল ধরে যাচ্ছে। যাতে করে এমবুশের শিকার হলে বড় মাপের ক্ষতি না হয়, আর রাস্তায় যদি টহল সেনারা আসে তবে তাদের যেন দেখতে না পায়। রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারকে ভেদ করে কয়েকজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে চলেন সামনের দিকে। এমনিতেই আমাবস্যার পর আজই ১ম চাঁদ উঠেছে। তবে আকাশে মেঘ থাকার কারণে চাঁদ বা তারার কোন আলো নাই। চারিদিকে আলকাতরার মত অন্ধকার। মুক্তিযোদ্ধারা চলছেন ছন্দময় গতিতে সারিবদ্ধ হয়ে। তবে তাদের ছন্দপতন হচ্ছে যখন কার্টুন বহনকারী যোদ্ধারা কার্টুন দুটি তাদের সহযোদ্ধাদের বদল করছেন। এলাকাটি কমান্ডারের নিজের এলাকা হওয়ায় পথ ভালোই চেনা।

কমান্ডার চলতে চলতে হঠাত্‍ তিনি সবাইকে থামতে নির্দেশ দিলেন। সবাই ভাবলো হয়ত যাত্রা বিরতি। কিন্তু তা না। কমান্ডার সবাইকে দ্রুত বসে পড়তে বললেন। যোদ্ধারা ক্ষেতের আলের উপর বসে পড়ল। তারপর কমান্ডার সবাইকে চার আলের মাঝে গোল হয়ে বসতে বললেন। তারপর সবার মাঝে বসে বললেন, “সামনে মনে হয় রাজাকার আছে,আমি বিড়ির আগুন দেখতে পেয়েছি।” তারপর সবাই মাথা উঁচু করে দেখতে পায় প্রায় আধা কিমি দূরে পাকা রাস্তা হতে যে মেঠো রাস্তা গ্রামের দিকে চলে গেছে সেই রাস্তার মাঝে একটি সিগারেটের আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। আগুনটা একবার বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠল তারপর আবার খানিকটা স্হিমিত হয়ে গেল। অতঃপর পূর্বের স্হানে আগুনটি ফিরে এসে পুনরায় জ্বলে উঠল।কারো বুঝতে বাকি রইল না যে ওখানে দুজন মানুষ আছে,আর আগুনের উচ্চতা দেখে মনে হল যে তারা উবু হয়ে বসে আছে। কমান্ডার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো এই ভেবে,এটা মোটামুটি মুক্ত এলাকা। কিন্তু রাজাকার আসবে কোথা হতে? নাকি ওরা সাধারণ গ্রামের মানুষ। কিন্তু এই রাত সাড়ে এগারটায় গ্রামের মানুষ এখানে আসবে কেনো??? তারপরেও ধরতে গেলে গ্রামে কোন মানুষ নেই। অতঃপর কমান্ডার শরীফ আর সিরাজকে নির্দেশ দিল যে ওদের কাছে গিয়ে দেখতে ওরা রাজাকার কি না সাধারণ মানুষ।

নির্দেশ পাওয়া মাত্র শরিফ আর সিরাজ ক্রলিং করে আলের উপর দিয়ে পাকা রাস্তার পাশে যে নালা ছিল তাতে নেমে গেল। কতগুলি কচুরিপানাকে ঢিবির মত করে তার উপর গুলির ম্যাগাজিন আর মেশিন গান রেখে আরো কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিল। অতঃপর তারা দুজন কিছু কচুরি পানা এক সাথে করে বড় একটা দল তৈরী করে তার মাঝে লুকিয়ে সামনের দিকে স্রোতের সাথে ভেসে চলল। যাওয়ার সময় তারা ঠেলে গোলা বারুদ লুকানো কচুরির ঢিবিটাকে নিয়ে চলল। প্রায় ২০মিনিট পর তারা পাকারাস্তা আর গ্রামের মেঠো পথের সংযোগকারী বাঁশের সাঁকোর এর কাছে পৌছাল তখন দেখতে পেল যে, মানুষ দুটি তাদের দিকে মুখ করে বসে আছে। তাদের দু একটা দেখছি তাওতো শালারা খেয়ে আমাদের ছোবড়া দেয়,”হোসেনের মেয়েটাকে অনেক ভালবাসতাম।ভাবলাম আমি তুলে নিয়ে বিয়ে করব, কিন্তু চেয়ারম্যান জসিম কুত্তা কেড়ে নিয়ে গেল।”তুলে দিল অফিসারদের কাছে। নিজেও কিছু পেলনা,আমাকেও কিছু দিল না। “কথাগুলা শুনে শরিফ আর সিরাজের বুঝতে বাঁকি রইল না যে এরা বাঙালি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কুলাঙ্গার সন্তান। তাদের দুজনের রক্তে আগুন ধরে গেল। শরিফ হাতে বেয়নেট নিয়ে চুপি চুপি এগিয়ে গেল, তার পিছু পিছু সিরাজ। নিঃশব্দে তারা রাজাকার দুটির পেছনে এসে দাঁড়াল। দুজন একসাথে রাজাকার দুটির মুখ চেপে ধরে বেয়নেট রাজাকার দুটির কন্ঠ নালীর মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়! সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে জানোয়ার দুটির অপবিত্র রক্ত বেরিয়ে আসে। ভিজে যায় সোনার বাংলার পবিত্র মাটি! শয়তান দুটির কাটা গলা থেকে বেরিয়ে আসে সদ্য জবাই করা গরুর গোঙানীর মত শব্দ, যা রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে দেয়। কিছুক্ষণ গলা কাটা ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে, তবে স্পষ্ট নয়। অতঃপর শরীফ আর সিরাজ সাকোকে অতিক্রম করে আরো কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে নিঃশব্দে পানি হতে ডাঙ্গায় উঠল। ধীরে ধীরে ক্রলিং করে মানুষ দুটির পেছনে রাস্তার অপর পাড়ে এক ঝোপে গিয়ে লুকিয়ে তাদের কথোপকথন শুনতে চেষ্টা করল।

-পাক বাহিনী যেভাবে মার খাচ্ছে তাতে তো সন্দেহ নাই যে পাক বাহিনীর হার নিশ্চিত…

-তবে আমাদের সমস্যা নেই…

-ক্যান?মুক্তিযোদ্ধারা মনে হয় তোর মামা শ্বশুর হয় যে তোকে না মেরে ছেড়ে দিবে?

-আরে ব্যাটা যদি অবস্হা বেশি খারাপ হয় তবে মুক্তিদের সাথে যোগ দিব…

-অতো সোজা না! ধরতে পারলে খবর আছে! বুঝলি?

-আরে শালার পাকবাহিনীর নাকি পৃথিবীর শ্রষ্ঠ মিলিটারি, কিন্তু কাজের বেলায় তো কিছু দেখছি না! শুধু যুদ্ধ হারে আর মরে।

-শোন,সবসময় যদি অফিসাররা মদ আর মেয়ে মানুষ নিয়ে পরে থাকে তাহলে যুদ্ধ জিতবে কেমন করে?

-তা ঠিক! মনে হয় ও দেশের মেয়ে মানুষের স্বাদ কম! হাঃ হাঃ

-তা বলি কেমন করে? ও দেশেরটাতো চেখে দেখি নি…

ঝোপ থেকে বার হয়ে শরিফ আর সিরাজ আস্তে আস্তে তাদের কাছে যায় এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে। শরীর দুটি শরিফ এবং সিরাজের সাথে ধস্তাধস্তি করে নিথর নীরব হয়ে যায়। শরীফ আগুন জ্বেলে সংকেত দিতেই কমান্ডার বুঝতে পারে কাজ শেষ। সে আবার বাকি সদস্যসহ মেঠো রাস্তার কাছে এসে শরীফ সিরাজের সাথে মিলিত হয়। তারা আবার সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। একসময় তারা চলতে চলতে ধূপ খোলা মাঠে এসে পৌছায়।

পৌছানোর পর কমান্ডার শরীফ,পাচু,সিরাজসহ কাটুনবাহী দুইজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে পানিতে নেমে ট্রান্সফর্মারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে এবং অন্য ৪মুক্তিযোদ্ধাকে পাকা রাস্তার ঢালের ঝোপে ২জন করে বিপরীত মুখি হয়ে আশ্রয় নিতে বলে। যেন প্রয়োজনে তারা কাভারেজ দিতে পারে। যদিও এ দিকটা মুক্ত অঞ্চল বলা যায় তবুও পাক সেনাদের বড় বড় বহর আচমকা চলাচল করে রসদ নিয়ে। যদি কোন কারণে পাকসেনা ব্যাপার আঁচ করতে পারে তাহলে আক্রমণ করলে পাকা রাস্তার দিক হতেই করবে। যাই হোক যে যার অবস্হানে পৌছে যায়। কমান্ডার শরীফ,সিরাজ,পাচুকে বলে খুব ভালো করে এক্সপ্লোসিভ বেল্ট গুলো পিলারে জড়াতে বলে। মনোযোগ দিয়ে পিলারের ইস্পাতের এংগেলের সাথে এক্সপ্লোসিভ বেল্ট জড়াতে থাকে। এর মাঝে শো শো শব্দ তুলে পাকারাস্তা দিয়ে ভারী সাঁজোয়া যান এগিয়ে আসতে থাকে। ক্রমশ গাড়িগুলোর হেড লাইট স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হতে থাকে। পাকা রাস্তায় পজিশন নেওয়া যোদ্ধা ট্রিগারে হাত দিয়ে শুধু কমান্ডারের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু কমান্ডার ওদিকে পিলারের কাছের সবাইকে পানিতে নেমে ঠোঁট পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে বলে। ওদিকে পাকা রাস্তার পজিশন নেওয়া যোদ্ধারা অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে। কিন্তু কোন নির্দেশ আসে না। অবশেষে একে একে পার হয়ে যায় সাজোয়া যান মাত্র কয়েক হাত দূর দিয়ে। তারা কখনো এতগুলি শত্রুসেনা এক সাথে এত কাছে পায় নাই। কিন্তু কিছুই করতে পারল না শুধু কমান্ডার নির্দেশ না দেওয়ায়। যদিও বা সংখ্যায় তারা মাত্র চার জন। কিন্তু তাদের ছিল ৪টি মেশিনগান ৮টি গ্রেনেড। যা নিয়ে নিমিষেই এমবুশ করা সম্ভব ছিল। মনে মনে তারা কমান্ডারকে গালি দিতে শুরু করে।

সাঁযোয়া যান নিরাপদ দূরত্বে চলে যাবার পর আবার কমান্ডার সবাইকে কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়। এক্সপ্লোসিভ জড়ালো শেষ হলে কমান্ডার নিজ হাতে ফিউজটা সেট করে। সেটি প্রায় ৩ফুটের মত ঝুলে থাকে। তারপর কমান্ডার চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে শরীফকে ফিউজে আগুন ধরাতে বলে এবং অন্য সবাইকে দ্রুত তারা যে পথে এসেছিল সেদিক যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়। শরীফ ১ম চেষ্টায় ম্যাচ জ্বালাতে ব্যর্থ হলে কমান্ডার চাপা স্বরে ধমক দেয়। সে দ্বিতীয় চেষ্টায় সফল হয়। তারপর কমান্ডার শরীফকে নিয়ে অন্য সবার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ফিউজটার সময় ছিল এক মিনিট। শরীফ মনে মনে এক, দুই,তিন সময় গুণতে থাকে এবং সেই সাথে কমান্ডারের পেছনে পেছনে হাঁটু পানি দিয়ে ছুটতে থাকে। কমান্ডার আর শরীফ একসাথে, অন্য সবাই বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। কমান্ডার ৪৫সে পর অগ্রবর্তী সবাইকে থামতে বলে। তারা একসাথে জড়ো হয়, ১০সে পর কমান্ডার আর শরীফ তাদের সাথে যোগ দেয়। যোগ দিয়ে কমান্ডার সবাইকে পিলারের দিকে তাকাতে বলে। ততক্ষণে তারা নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছে।

কিছুক্ষণের মাঝেই বিকট শব্দ করে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের ধাতব সংঘর্ষের শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে যায়, রাতে নিঃস্তবদ্ধতা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়। আমন ক্ষেতের মাঝে কচুরিপানার উপর বাসা বানানো একজোড়া জল পিপি তাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়। বিশাল পিলারটি বিশালত্ব নিয়ে হাঁটু ভাঙ্গা মানুষের মত লুটিয়ে পড়তে থাকে। ট্রান্সফর্মারের দুই দিকে স্পাকিং হতে দেখা যায়। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই এক সাথে বলে ওঠে জয় বাংলা!!! তাদের এই জয় বাংলা স্লোগান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তারপর তারা বেশ খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর শুনতে পায় বিকট শব্দ। পেছনে ফিরে দেখে যে ট্রান্সফর্মারটি বিস্ফোরিত হয়ে জ্বলতে শুরু করছে। আর সেই আগুনের শিখার আলোকছটা ছড়াচ্ছে বহুদূর পর্যন্ত।

মুক্তিযোদ্ধারা বীরদর্পে এগিয়ে যেতে থাকে তাদের ক্যাম্পের দিকে।।

।..সমাপ্ত..।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: