ধুলোয় মিশে যায় রংগুলো

ভালবাসা এসেছিল। একটি ১৪-১৫ বছর বয়সী মেয়ের জীবনে আশা ভালবাসা, সারাজীবন লালন করে রাখার মত ভালবাসা ছিল সেটি। জীবনের প্রথম প্রেম, না বোঝা ভালবাসা যা এসেই হারিয়ে গেছে ভোরের ধুমকেতুর মতন..

সাল ২০০৮.. লন্ডন এর পাবলিক বাস এর কোনো একটিতে দোলন তার মা আর ভাইকে করে চার্চ এ যাচ্ছিল.. স্বভাবতই প্রথমবার তারা ওই চার্চ এ যাচ্ছিল আর রাস্তা তাদের জানা ছিল না.. দোলন এর দৃষ্টি পরে বেশ কাছাকাছি দাড়ানো একটি ছেলের দিকে যে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই দোলন কে লক্ষ্য করে যাচ্ছে.. অস্বস্তিকর এই অবস্থায় সে শুধু অন্য দিকেই তাকিয়ে থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে.. কিছুটা এইভাবেই প্রথমবার দেখা হয়েছিল দোলন আর বাবুল এর.. নিজের দেশ থেকে সহস্র মাইল দুরে যুক্তরাজ্যে..

সেইদিন আধঘন্টা পরেই অবশ্য ছেলেটার সম্বন্ধে ধারণা পাল্টে যায় দোলনের.. ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে ওকে বিপর্যস্ত করতে চায়নি, বরং সে ওদের কথা শুনে বুঝতে পেরেছিল সে নিজে যেখানে যাবে এরাও সেখানে যেতে চায়.. বাস থেকে নামার পর ওদের কে সাহায্য করতে আসে বাবুল এবং পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় গন্তব্যস্থল এ.. সেইদিন প্রথমবার ওই দালান এর মাটিতে পা রেখে দোলন ধারণা করে নিতে পারে নি, এখন যাদের কে ও চিনবে একদিন তারাই ওর জীবনটা সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে.. হোয়াইট চ্যাপেল এর এই চার্চ এ মিলিত হত লন্ডন এ থাকা ছোট্ট বাঙালি খ্রিস্টান সমাজের কিছু মানুষজন.. বাবুল এদেরই যুবদলের একজন.. স্বভাবতই জায়গাটা ভালো লেগে যায় দোলনের, বেশ কয়েকজন বন্ধুও হয়ে যায় তার এখানে.. এইভাবেই দিন কাটতে থাকে দোলনের, নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে বেশি সময় লাগে নি তার..

২০০৯ এর শুরুর দিকে দোলন প্রথম ফেইসবুক আইডি খোলে এবং বন্ধুদের লিস্ট এ বাবুল কেও যোগ করে.. তাদের মধ্যে কথা বার্তা বেড়ে যায়.. তারা ভালো বন্ধু হয়ে উঠে.. দুইজন দুইজনের সম্বন্ধে কিছুদিনেই পারদর্শী হয়ে উঠে.. বাবুল দোলনের থেকে ৭-৮ বছরের বড়.. দোলন ঠিক করে ওর বড় বোনের কারো সাথে বাবুল এর লাইন করে দিবে, এইরকম মশকরা করতে করতেই কি ওদের মধ্যে নিঃশব্দে ভালবাসা ঠাই করছিল দোলন আজ তাই ভেবে অবাক হয়.. ওরা ঠিক করে বন্ধুত্ততার খাতিরে একদিন বাইরে দেখা করবে.. দোলন বাবুল এর মোবাইলে কল করে নিজের মা’র মোবাইল থেকে কিন্তু বাবুল ধরে না.. বাইরে থেকে এসে দোলন শুনে বাবুল এর সাথে মা’র কথা হয়েছে এবং স্বভাবতই মা প্রচন্ড রেগে আছেন.. মা জানিয়ে দেন বাবুল এর সাথে যাতে আর কোনো যোগাযোগ না রাখা হয়.. এই কাহিনী বাবুল এর উপর অনেক প্রভাব ফেলে, সে নিজেকে দোষী মনে করে দোলন এর বাসায় কলহল এর জন্য..

তবুও তারা তাদের বন্ধুত্ব ছাড়তে পারে না.. এমনি কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে বাবুল দোলন কে জানায় যে সে তাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে, সে কি তাকে একটি চান্স দিবে কিনা.. দোলন এই বন্ধুত্ব কে অন্য কিছুতে পরিণত করতে নারাজ.. তবুও বাবুল হার মানে না.. দোলন এক সপ্তার সময় চায়.. এক সপ্তায় দোলন ভেবে পায় না কি করবে তাই কিছু না ভেবেই সে চান্স দিতে রাজি হয়.. তারা খুব কম দেখা করত, কিন্তু ফোন এ সারাক্ষণ যোগাযোগ হত.. দোলন এর স্কুল এর পরে ওরা ঘুরত, বাবুল সব কাজ ফেলে দিয়ে ছুটে আসত দোলনের সাথে দেখা করতে.. ইস্টার এ চার্চ এ সবার চোখ ফাকি দিয়ে খাবার ভাগ করে খেত, ধর্মীয় টিভি’র অনুষ্ঠান এর শুটিং এ দোলন নাচত আর বাবুল লুকিয়ে সেট-এ গিয়ে তা দেখত, সবার মধ্যে থাকলে চোখে চোখে ইশারা করত দুজন দুজনকে, একজন না খেলে আরেকজন খেত না, দোলন কথায় কথায় রাগ করত আর বাবুল রাগ ভাঙ্গানোর জন্য মরিয়া হয়ে যেত.. দোলন এর লম্বা চুল কাটা বারণ করে দিয়েছিল বাবুল, চুল কাটলে দোলন এর হাত কেটে দিবে এমনি একটা বোঝাপড়া হয়েছিল তাদের মাঝে…

ঠিক দুই মাসের মাথা দোলনের ফোন মা’র হাতে পড়ে বাবুল এর মেসেজ সহ… বাসায় কলহলের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়.. তার মা বেপারটা চার্চ এর প্রধানকে জানান… ঐদিকে দোলন কাঁদে এইদিকে বাবুল এর অবস্থা খারাপ.. কিন্তু তবুও তারা দুইজন দুইজন কে ছাড়ে না.. পুরো চার্চ এর মানুষ এর বিপক্ষে, তাই বাবুল সিদ্ধান্ত নেয় সে চার্চ এ আর যাবে না.. প্রতিদিন এই লাঞ্চনা-গন্চনা’র মাথায় ওরা আবার ধরা খায়.. যতকিছুই হয়ে যাক ওরা জানত ওরা নিজেদের ছেড়ে থাকতে পারবে না… কিন্তু ভবিষ্যতে একসাথে থাকার খাতিরে তাদের যোগাযোগ এখনকার মত অনেক কমিয়ে দিতে হবে.. এই সিদ্ধান্ত পাক্কা করতে ওরা শেষবারের মত দেখা করে..

ফেরার পথে বাবুল দোলন এর জন্য কিছু কিনতে যায় দোকানে… অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিল, তাই বাবুল দোলন কে বলে কোনো বাস পেলে যাতে ওর জন্য অপেক্ষা না করে উঠে যায়.. বাস চলে আসে, দোলন বাধ্য হয়ে উঠে, প্রার্থনা করে যাতে বাবুল বাস তা ধরতে পারে.. বাবুল দৌড়ে আসে, কাচের জানালা’র ওপাশ থেকে দোলন এর হাতটা একটু ছোয় আর বাসটা সাই করে এগিয়ে চলে যায়.. দোলন দেখে বাবুল বাস এর পিছনে ছুটছে, আর তার মনে ডাক দেয় এই দেখাই কি শেষ দেখা? কিন্তু আজকের দিনটি পর্যন্ত যদি ঐটাই শেষ দেখা হত জীবনটা এত কষ্টের হত না.. না ঐটাই শেষ নয়..

সেইদিন থেকে সামারের ছুটি শুরু হয়ে যায়… দেড়মাস কোনো কথা বার্তা হয় না.. স্কুল এ ফিরে গিয়েই দোলন যোগাযোগ করে বাবুল এর সাথে.. বাবুল ওকে শীঘ্রই দেখা করতে বলে.. দুইদিন এর মাথায় তাদের দেখা হয়.. বাবুল এর ভাষ্য কিছুটা এইরকম ছিল, ” আমাদের চার্চ এর মানুষ বাংলাদেশে মা বাবা কে ফোন করে সব কিছু বলে দিয়েছে, আর তার সাথে সাথে এইটাও বলেছে যে যেই মেয়েটার সাথে আমার সম্পর্ক সে সুবিধার মেয়ে না.. বাবা হৃদরোগী.. সে বলেছে, হয় তুমি নয়তো পরিবার.. আমাদের এই সম্পর্ক তোমার আমার কারো জন্যই ভালো নয়.. আমাদের এইটা ভাঙ্গতে হবে… ডিসেম্বর এ আমি দেশে যাব কিছুদিনের জন্য, তার আগেই আমাকে ডিসিশন জানাও.. ৩ মাস আছে…”.. কথাগুলো শুনে দোলন যতটা কষ্ট পেয়েছিল তার থেকে বেশি কষ্ট লাগছিল বাবুল কে দেখে, ওকে দুঃখী রেখে দোলন কোনো সুখ ভাবতেই পারছিল না.. কোনো জবাব না দিয়েই চলে এলো দোলন.. নিজের বেস্টফ্রেন্ড কে দিয়ে ফোন করালো, কিন্তু বাবুল এর ডিসিশন বদলাতে পারল না.. নাওয়া খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল তার.. আসতে আসতে অসুস্থ হতে শুরু করলো..

এরকমই এক সময়ে বাবুল এর সাথে আবার দেখা করতে চাইল সে, করলো আর শুধু একটা প্রশ্ন করলো, ”কখনো কি আমার ভালবেসেছিলে?”.. বাবুল জবাব দিল না, শুধু বলল, ”সব ঝেড়ে ফেলে দেও, নতুন ভাবে জীবন শুরু কর.. জানি কঠিন না.. পারবে..”.. দুঃখে কষ্টে দোলন আর কান্না ধরে রাখতে পারল না, দোলনের মনে আছে বাবুল বলেছিল একবার, ‘প্লিজ ফোন এ কেঁদো না, আমার সামনে এসে আমার বুকে মাথা রেখে মনের শখ মিটিয়ে কেঁদো..” সেই সুযোগ দোলনের হয় নি, কাদতে কাদতে বাবুল কে কিছু স্মৃতি ফিরিয়ে দিল, যা উপহার সরূপ বাবুল তাকে দিয়েছিল.. এক মুহূর্ত দেরী না করে দোলন চলে আসল..

দুইদিন পর দোলন কে হাসপাতাল এ দেখা গেল.. অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল সে, মৃত্যু-পথযাত্রী হয় নি, শুধু অনেক অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল.. পরের দুই বছরে দোলন অনেক সামলে উঠলো আস্তে আস্তে, শুধু সে রাতে ঘুমাতে পারত না, প্রতি রাতে ঈশ্বর এর কাছে বাবুল কে ফিরে চাইত, রাস্তায় বেরুলে চারদিকে দেখতে থাকত বাবুল কে দেখা যায় কিনা, জন্মদিনগুলোতে বাবুল এর অপেক্ষা করে থাকত, ভালবাসা দিবসে আর বাবুল এর জন্মদিনে উপহার কিনে জমিয়ে রাখত, মাঝে মাঝে অনেক অসুস্থ হয়ে যেত যে হাসপাতালে ভর্তি করানো লাগত.. এরকম সময়ে একদিন দোলন ঠিক করলো বাবুল যেভাবে ওকে ভুলে বসে আছে সেইভাবে সে নিজেও বাবুল কে ভুলে যাবে.. ভুলতে হবেই.. মানুষ চাইলে কিনা পারে.. দোলন নিজেকে পড়াশোনায় আর অন্যান্য কাজে এমনভাবে জড়িয়ে ফেললো যাতে বাবুল এর কথা মাথায় সহজে না আসে.. তবুও প্রতি রাতে সে বাবুল এর জন্য প্রার্থনা করতে ভুলতো না.. আর ভুলতো না বাবুল কে, এক মুহুর্তের জন্যও না…

এর মধ্যেই দোলন এর একটি ছেলে বন্ধুকে ফেইসবুকে যোগ করে বাবুল, আর সেই বন্ধু দোলন কে বলে দেয়.. দোলন কিছু না বুঝেই ওর বন্ধু কে বলে দেয় বাবুল কে ডিলিট করে দিতে.. কিন্তু বাবুলকে ফিরে পাওয়ার আশা পেয়ে গত কিছুদিন আগে আর না পেরে বাবুল কে ফোন করে দোলন, বাবুল বুঝতে পারার সাথে সাথে ফোন কেটে দেয়.. আবার ফোন দিতেই ফোন ধরে বাবুলের কোনো এক বন্ধু, যে কোনো মতেই বাবুল কে সে ফোন দিল না.. ২০ মিনিট দোলন ফোন এ অনুনয়-বিনয় করতে থাকলো, কেদে দিল, তবুও বাবুল ফোন টা নিল না.. কেন নেয় নি দোলন সেদিন তা বুঝে নি…

আজ ফেইসবুক খুলতেই চোখে পরে চার্চ এর এক সদস্যের পোস্ট করা নতুন এলবাম.. প্রথমেই ওটাকে কিছুটা না দেখার চেষ্টায় আবার কি ভেবে খুলে বসে দোলন.. নিজের চোখ অন্ধ না হয়ে যাওয়ার আফসুস করে সে পরক্ষনেই, কিছু না ভেবে সে হোহো করে হেসে উঠে ঘর কাপিয়ে, ছবিগুলোয় চোখ বুলিয়ে আরো অনেকক্ষণ জোরে জোরে চিত্কার করে, হাসির মত শব্দ, কিন্তু সে কি সত্যি হাসে? অ্যালবাম টি বাবুলের গায়ে হলুদ এর এলবাম, যা ঘটিত হয়েছে গতকাল রাতে.. অন্য একটি মেয়ের পাশে বসে কত হাসি মুখে গায়ে হলুদ মেখে বসে আছে.. এত সুন্দর বাবুল কে মনেহয় আগে কখনো লাগেনি… দোলনের জীবন মনে হয় উথাল-পাথাল হয়ে গেল…

দোলন ভেবেছিল, বাবুল আসবে.. আর যদি নাও আসে তবুও সে অন্য কারো হবে না, আর হলেও দোলন জানতে পারবে না, এই কষ্টটা পাবে না.. দোলন ভেবেছিল, বাবুল কে হৃদয়ে রেখে সারাজীবন কাটিয়ে দেবে সে.. কিন্তু এখন দোলন শুধু চায় বাবুলের বিয়েতে নাচতে, মনের শখ মিটিয়ে নাচতে… নাচতে নাচতে সব ঝেড়ে ফেলে দিতে.. আর নাচতে নাচতে মাটিতে গড়িয়ে পড়তে, ধুলোয় মিশে যাওয়া রঙের মত…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: