এস. আলম পরিবহনে বসে আছে হিমেল…কমলাপুর স্টেশন…

এস. আলম পরিবহনে বসে আছে হিমেল…কমলাপুর স্টেশন…
বাসটি ঢাকা-চট্টগ্রাম হয়ে রাংগামাটি যাবে । এটাই শেষ ট্রিপ, রাত ১২ টার সময়। যদিও ১২টা ছুয়ে ফেলেছে ঘড়ির কাঁটা। বাস প্রায় ভর্তি, শুধু তার পাশের সিট ও পাশের লাইনের ২ টা সিট খালি। হিমেল ভাবতে থাকে আল্লাহই জানে তার পাশের সিটের মানুষটা কে হয়! ঢাকা আসার সময় তো মাশাল্লাহ ১৩০ কেজি ওজনের এক ভদ্রলোক পড়েছিল!! সারাটা পথ নাক ডেকেছে, কিছু বলতেও পারেনি বাবার বয়সী বলে, আসলে সহযাত্রী যদি খাপছাড়া পড়ে তাহলে পুরো ভ্রমন টাইমাটি । সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা যখন স্মরন করছিল ঠিক তখন হুড়্মূড় খেয়ে ৩ জন যাত্রী উঠল, ২ জন নারী, ১ জন পুরুষ। দেখেই বুঝা যায় নব দম্পতি। আর মেয়েটা বর বা বউ এর বোন হবে হয়তো। হিমেল এর বুঝতে অসুবিধা হলনা এরাই ৩ টি পাশের সিট এর যাত্রী, আর এদেরই একজন আজ রাতের ভ্রমনের সহযাত্রী, কিন্তু কে সে দেখা যাক….. স্বামী তার নব বধূ কে বলল তুমি আর হেমা একসাথে বসো, আমি ঐ সিট এ বসি, হিমেলের পাশের সিটটা দেখিয়ে বলল। বউটি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, না তুমি আমার পাশে বসো, হেমা ঐ সিট এ বসুক…

নব দম্পতি তো….. ভালবাসাটা একটু বেশিই। এতক্ষনে হিমেল মেয়েটির নাম যেনে গিয়েছে, অবশেষে হেমাই হিমেলের সহযাত্রী হল। ১২ টার গাড়ি ১২:১৫ মিনিটে ছাড়ল।

: এই যে হেমা, আমি হিমেল।
: আপনি আমার নাম জেনে ফেলেছেন?
: হুমম।
: বুঝছি, ভাইয়া যখন আমার নাম নিয়েছিল তখন শুনে ফেলেছেন।
: উনি বুঝি আপনার ভাইয়া?
: হ্যা, আর পাশের সুন্দরীটি ভাবী। ভাইয়া ফরেস্ট অফিসার, রাংগামাটি তে পোস্টিং, বিয়ের পর বাসা পেয়েছে, তাই ভাবী কে নিয়ে যাচ্ছেন । আমার এস, এস, সির রেজাল্ট বেরোলেই আমিও ওখানেই ভর্তি হব । ভাবী একলা তো । মা তো বড় ভাইয়ার ছেলে ছাড়া থাকতে পারেনা, তাই উনি ঢাকাতেই থাকেন । এভাবে তাদের কথোপোকথন চলতে থাকল, তখন ও মোবাইলে mp3 এর ততো প্রচলন হয়নি। হিমেল তার ওয়াকম্যানটি বের করল, হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে লাগলো। ‘এই কূলে আমি আর ঐ কূলে তুমি মাঝখানে নদী ঐ বয়ে চলে যায়’ হেমা বলল আপনি গান ভালবাসেন?
:খুব
:কি গান শুনছেন দেখি?

হিমেল হেডফোনেটি বাড়িয়ে দিতে গেলে হেমা শুধু একটি মাইক নিলো বাকিটা হিমেলকে দিল, দুজন একসাথে গান শুনতে লাগল । দেখে মনে হচ্ছে তাদের কত দিনের জানা শুনা…
দেখতে দেখতে কুমিল্লা এসে গেল, বাস থামল কানন রেস্টুরেন্টে, হেমা চলে গেল তার ভাইয়ের সাথে, হিমেল আলাদা টেবিল এ বসে হাল্কা নাস্তা সেড়ে নিলো, আর সাথে ২ পেকেট
চিপস নিলো । বাস এ উঠে চিপস খেতে খেতে হেমা হঠাত বলে উঠল, আরে আমিতো আপনার
সম্পর্কে কিছুই জানলাম না। আমি হিমেল, ঢাকায় গিয়েছিলাম বোনের বাসায় বেড়াতে আর একটা ট্রাভেল এজেন্সি তে ইন্টারভিউ দিতে, বাইরে যাবার চেষ্টা করছি, ডেলিগেট আমাকে সিলেক্ট করেছে, হয়তো মাসখানেকের মধ্যে চলে যাব । আমার বাড়ি সন্দ্বীপ্, সামনে সীতাকুন্ড /
বারকূন্ড তে নেমে যাবো । তারপর ট্রলার এ করে সন্দ্বীপ যাব । আমি আর গান শুনবনা আপনি একলাই শুনেন, হেডফোনটা হেমার দিকে বাড়িয়ে বলল হিমেল। একসময় গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল হেমা, হিমেল ও । গাড়ি সীতাকূন্ড ক্রস করবে একটু পর… হিমেল কে এখানে নামতে হবে, হেমা তখনো ঘুমোচ্ছে, হেডফোন কানে লাগানো।। হিমেল ভাবছে, তাকে কি জাগাবে? না থাক জাগালে আবার ভাববে তার ওয়াকম্যানের জন্য জাগিয়েছে । ঘুমন্ত পরীটার দিকে একবার তাকিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ল । তারপর যতক্ষন চোঁখের আঙিনায় ছিলো তাকিয়ে থাকলো সেই বাসটির দিকে।

হঠাত ঘুম ভাংলো হেমার…
ততক্ষণে বাস চট্টগ্রাম সিটি তে এসে গেছে, পাশের সিটটা খালি !! আরে হিমেলের ওয়াকম্যানটা তো নিয়ে গেলনা ! কেমন মানুষ আমাকে একবার বলেও গেল না । কোন ঠিকানাও নেই যে তার সাথে যোগাযোগ করবে । বাসায় ফিরে হেমা ক্যাসেট প্লেয়ারটি শুনছিল, শেষ পর্যায়ে কিছু ভয়েস রেকর্ড শুনতে পেল । হিমেলের আপু আর তার ভাগ্নের, মা তার বাচ্চাকে তার দাদার বাড়ি, নানার বাড়ির ঠিকানা শিখাচ্ছিলো । হেমার চোঁখ মুখ আনন্দে ফুটে উঠল, মোটামুটি একটা ঠিকানা পেয়ে গেল হিমেল এর…

১ মাস পর–

হিমেল তার বিদেশ যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিচ্ছে, কাল সকালে তার ফ্লাইট। এমন সময় পোস্টম্যান এসে তাকে একটা পার্শ্বেল প্যাকেট দিয়ে গেল, খুলে দেখে তার ওয়াকম্যান! সাথে একটা চিরকূট — এভাবে আমাকে না বলে নেমে গেলেন গাড়ী থেকে? আপনার ওয়াকম্যানটা ফেরত দিলাম তবে ক্যাসেটটা রেখে দিলাম স্মৃতি হিসেবে, নাম্বারটা আমার ভাবীর, কল করবেন, ইতি– হেমা।

কল আর করা হলোনা, তাড়াহুড়ো করে দেশ ছাড়লো হিমেল, আরো একমাস পর বিদেশ থেকে কল করলো হিমেল,
– আমি কি একটু হেমার সাথে কথা বলতে পারি?
– তার আগে বলেন আপনি কে?
– আমি হিমেল…
– তাই? অনেক শুনেছি আপনার কথা, একটু লাইনে থাকেন। ( হেমা তোমার ফোন)
এই বলে মোবাইল টা এগিয়ে দিলো হেমার ভাবী। এরপর থেকে শুরু, এভাবে চলতে থাকে কথা। প্রতি সপ্তাহে ফোন করে হিমেল, আস্তে আস্তে সেটা বেড়ে প্রতিদিন পর্যায়ে নেমে এল, কোন কোন দিন ২/৩ বার ও কথা হয় তাদের্। এখন এটাকে শুধু ফ্রেন্ড-শীপ বলা যায়না, এটা অনেক আগেই ভালবাসায় রূপান্তর হয়ে গেছে।

১ বছর পর–

হিমেল দেশে ফিরবে কাল, খুব খুশী সে, বাবা, মা, বোনের পাশাপাশি আরো একজন তার পথ পাণে চেয়ে আছে। তার মনে অনেক চিন্তা-ভাবনা , রাংগামাটি ঘুরতে যাবার নাম করে হেমার ভাইয়ের সাথে দেখা করে, তাদের ব্যাপারে আলাপ করে গ্রীন সিগন্যাল পেলে বাবা কে পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবেই বিয়ে করে হেমা কে ঘরে তুলবে।

-হেমা, শুনছো আমি বের হচ্ছি, ২ ঘন্টা পর আমার ফ্লাইট, টোটাল ৭/৮ ঘন্টা পর আমি দেশে!!
দোয়া করো, Bye, see u soon জান। ফোন করে জানিয়ে দিলো হিমেল।

আজ মন টা অনেক ফুরফুরে হেমার, কলেজ্ থেকে এসে টিভি ছেড়ে দিলো। আজকাল টিভি খুললেই খালি খবর আর খবর। হঠাত ব্রেকিং নিউজ !! দুবাই বিমান বন্দর থেকে ছেড়ে আসা
দুবাই- চট্টগ্রাম ফ্লাইট বিধ্বস্ত !!! যাত্রীদের সবাই বাংলাদেশী প্রবাসী, বেশির ভাগ যাত্রীর প্রাণ হানী হয়েছে। এই ফ্লাইট এ তো হিমেলের আসার কথা!!! ‘ভাবী’ বলে চিত্কার করে অচেতন হয়ে পড়্লো হেমা। হাসপাতালের বেড এ শুয়ে আছে হেমা, অনেকটা অচেতন এখনো, ভাবীর কাছে জানলো ঐ ফ্লাইট এর কেউ ই বেঁচে নেই, হিমেল ও ঐ ফ্লাইটে ছিলো, তার মোবাইল বন্ধ… আমরা ট্রাই করেছি। সেও বোধ হয় আর বেঁচে নেই। এমন সময় ভাবীর মোবাইলে একটা ফোন আসল, দেশের বাইরের কল, তবে অপরিচিত….

ভাবী, আমি হিমেল,
-তুমি বেঁচে আছো?
-বিমানে যাত্রী বেশী হয়ে যায়, কারণ আমাদের আগের ফ্লাইটটা ছাড়তে পারেনি যান্ত্রিক ত্রূটির কারণে। তাই আমাকে পরের ফ্লাইটের টিকেট ধরিয়ে দেয়। মোবাইলের সিম পাল্টে দেশের সিম লাগিয়েছি তাই ফোন বন্ধ ছিল।
-থ্যাংকস আল্লাহ। তোমার হেমা তো মৃত্যূ শয্যায়, কথা বলো তার সাথে।
-পাগলী, তুমি যদি মরে যাও আমি কার জন্য বেঁচে থাকব? তুমি কিন্তু এয়ারপোর্ট এ আসবে, আমি সব ম্যানেজ করে ফেলেছি, বাবা মা কে জানিয়েছি আমাদের কথা। বিমান ছেড়ে দিবে ৩০ মিনিট পর, ভালো থেকো, দেখা হবে শীঘ্রই– একসময় পাঁখা মেলে উড়লো বিমানটি সেই
সাথে উড়লো হেমা- হিমেলের স্বপ্ন ও।

উত্স্বর্গ- ১১ বছরের বন্ধূত্ব জীবনে একবারই তার সাথে দেখা হয়েছিলো তাও ২০ মিনিটের জন্য, সেই ‘মাহমুদ হাসান’ কে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: