অসমাপ্ত সমাপ্তি

কাল থেকে আবার ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে। নতুন ছাত্র ছাত্রী ভর্তি হবে। আমি আবার ওদের ক্লাস টীচার। সকাল সাতটায় প্রধান শিক্ষক স্কুলে উপস্থিত থাকতে বলেছেন। বুঝতে পারছিনা কী হবে। আমি মানুষ হিসেবে বেশ এলোমেলো স্বভাবের। এতগুলো বাচ্চাকে একসাথে কন্ট্রোল করতে পারবো কিনা জানিনা। কিন্তু চাকুরীর প্রয়োজনে করতেই হবে। ঢাকা শহরে বর্তমানে চাকরীর খুব আকাল। এছাড়া ব্যাচেলরদের কেউ বাড়ি ভাড়াও দিতে চায়না। সেক্ষেত্রে এই চাকুরীটার একটা সুবিধা আছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ দুই রুমের একটা বাসাও ঠিক করে দিয়েছে। মোটামুটি আরামের চাকরী। প্রতি মাসে বেতনের এক অংশ চলে যায় মৌরীর শখ পুরন করতে। যদিও মৌরী আমার কাছে নেই আজ দশ বছর। তারপরেও ওর শখটা যত্ন করে আমি টিকিয়ে রেখেছি। খুব অদ্ভুত স্বভাবের ছিল মেয়েটা।

আমার সাথে মৌরীর প্রথম পরিচয় ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের সামনে। বেচারা ধানমন্ডি থেকে রিকশায় এসেছে। সম্ভবত বিশ টাকার একটাই নোট ছিল ওর কাছে। কিন্তু ঢাকা শহরের রিকশা ওয়ালা বলে কথা। একটু ছেঁড়া নোট হওয়াতে নোট পাল্টিয়ে দিতে বলা হল। আমি অনেক্ষন ধরেই ব্যপারটা লক্ষ করছিলাম। দেখলাম বেচারার মায়াবী মুখখানা শুকিয়ে গেছে। শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝড়ছে। রিকশাওয়ালা ক্রুর হাসি দিল। স্টিভ জবস আইপড আবিস্কার করে যেমন হাসি দিয়েছিলেন অনেকটা তেমন। আমি কাছে গিয়ে বললাম দেখ যদি কিছু মনে কর তবে আমি ভাড়াটা দিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে কয়েক মিনিটের জন্য হাতেম তাই মনে হল।মৌরী বিব্রত বোধ করলেও কিছু করার ছিলনা।

সুন্দর মেয়েদের প্রতি আমার আকর্ষন ছোটবেলা থেকেই। তবে অদ্ভুত সুন্দর বলে সাহিত্যে একটা কথা আছে। এই প্রথম কোন মেয়ের মাঝে আমি এই ব্যাপারটা লক্ষ করলাম। স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া একখানি করুন চোখের বিমর্ষ চাহূনী এক নিমিষে আমাকে আরো এলোমেলো করে তুলল। মৌরী আমাকে ধন্যবাদ না দিয়ে বলল অনেক করেছেন। কষ্ট করে বারোটার দিকে এখানে একটু আসবেন। আমাকে নিতে মামা আসবে। আপনার টাকাটা ফেরত নিয়ে যাবেন। মুখ থেকে ফস করে একটা কথা বের হয়ে গেল। বললাম তুমি এত সুন্দর ক্যানো?

উত্তর এল অপদার্থ কোথাকার। মনে ভাবলাম সত্যিই এই পৃথীবিতে উপকারীর কোন দাম নেই। এক মুহুর্তে নিজেকে বাই প্রোডাক্ট মনে হল। আমার চেহারা মোটামুটি খারাপ না। রাস্তার পাশে রাখা একটা গাড়ীর কাঁচে নিজেকে দেখে নিলাম। না কোথাও অপদার্থের ছায়া নেই। মৌরি চলে গেলে আমি ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেদিন আর ক্লাসে গেলাম না। আনন্দ সিনেমা হলের সামনে পরম আনন্দে বাদাম চিবুতে লাগলাম। প্রায় সাড়ে বারোটার দিকে মৌরী এল। আমাকে দেখে একটু হাসল। বলল এই নিন আপনার টাকা। দেখলাম ভাঁজ করা একটা পঞ্চাশ টাকার নোট। শুনুন বাসায় গিয়ে টাকাটা খুলবেন। আজ আসি।

আমি তখন তেজতুরী বাজারের একটা হোস্টেল থাকি। খুব দ্রুত হোস্টেলে ফিরে এলাম। টাকাটা খুলে একটু অবাক হলাম। সাথে একটা চিরকুট। যেখানে লেখা আমি মৌরী। UCC তে পড়ি। আজ অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচালেন। কাল ঠিক দশটায় পূর্বের জায়গায় উপস্থিত থাকবেন। চিরকুটটি পড়ে আনন্দে আত্নহারা হয়ে গেলাম।

এরপরের দিনগুলি ছিল খুবই মজার। প্রতিদিন আমাদের দেখা করা। ধানমন্ডী লেকে হাঁটা। ফুচকা খাওয়া। মাঝে মাঝে চন্দ্রিমায় গিয়ে জীবনের গল্প শোনা। ভার্সিটি লাইফেও আমরা একসাথে ছিলাম। মৌরী ভর্তি হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। আমি বাংলায়। ভার্সিটির তৃতীয় বর্ষে থাকা কালীন সময়ে আমি মৌরীকে প্রথম ভালোবাসার কথা জানাই। প্রথমে সম্মতি না দিলেও একটা পর্যায়ে ও রাজী হয়ে যায়। এরপরের সময় গুলো শুধুই দু জনার। আনন্দ বেদনা হাসি কান্না এক হয়ে মিশে গিয়েছিল আমাদের সম্পর্কে। মৌরীকে আমি অনেক ভালোবাসতাম। অনেক। যতটা ভালো একটা মানুষকে বাসা যায় তার চেয়েও বেশি।

ভার্সিটির শেষ বর্ষে এসে মৌরীর বিয়ে হয়ে যায়। আমি তখন বেকার। যদিও মৌরী ওর বাবা মাকে আমাদের সম্পর্কের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু বেকার ছেলের হাতে কেউই তার মেয়েকে তুলে দেবেনা। সবাই জানতো। আমিও জানতাম। আর তাই শেষ বার যখন মৌরীর সাথে আমার দেখা হয় তখন আমার উদাসীনতা ওকে বিচলিত করে তুলেছিল। ও অনেক বার বলেছিল পালিয়ে বিয়ে করতে। কিন্তু আমি ভালোবাসার পবিত্রতাকে নষ্ট করতে দেয়নি। তাই ওকে বলেছিলাম সম্ভব নয়। সেই নীল দু’টি চোখে টলমল জল কতটা আবেগ বহন করেছিল আমি জানিনা তবে মৌ চলে যাবার পর ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল। ঢাকা শহরের সব মানুষ সেদিন তাকিয়ে দেখেছিল মুষল ধারে বৃষ্টিতে একটি ছেলে উদভ্রান্তের মত হাঁটছে। নিজের জীবনকে তখন থেকেই অর্থহীন লাগা শুরু করল। মৌরীর শখ ছিল ফটোগ্রাফি করা। আর তাই শত কষ্টের মাঝেও মৌরীর এই শখটা আমি টিকিয়ে রেখেছি।

মৌরীর সাথে এটাই আমার শেষ দেখা। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হত ওর কাছে। ও বলতো দেখ শ্রাবন তোমাকে এক উদাসীন থাকলে চলবেনা। প্লিজ কিছু একটা করো। তোমাকে ছাড়া বাঁচতে আমার কষ্ট হবে। তুমি কয়েকটা টিউশনি করাও। তুমিতো ভালো লেখালেখি কর। পত্রিকায় জমা দাও। আমাদের বিয়ের পর আমরা একটা বাসা ভাড়া করবো। প্রয়োজনে আমিও দু একটা টিউশনি করাবো। আমাদের বেশ চলে যাবে। মৌরীর কথা শুনে হাসতাম। প্রবল জোড়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাসতাম। বলতাম দেখ মৌ,জীবনটা বাংলা সিনেমা না। বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতেই হবে। সত্যিই আজ বাস্তবতার শীকার আমি। খুবই সুন্দর ভাবে নিজেকে মানিয়েও নিয়েছি। কি অদ্ভুত সুন্দর আমাদের চারপাশ। কৌতুহল ভরে ঢাকার রাস্তায় হাঁটি আর ভাবি হয়তো তুমি এই শহরেরই কোন এক অট্টালিকায়। জীবনের বাস্তবতায় কথনো কি দেখা হবে আমাদের? মৌরী চলে যাবার পর মাঝরাতে প্রায়ই ঘুম ভেঙে যেত। প্রবল বৃষ্টিকে মৌরীর কান্নার শব্দ মনে হত। ভাবতাম আকাশের ও কি মৌরী নামে কেউ ছিল। যার জন্যে এত কান্না। এত মেঘ। এত বর্ষন। প্রতিদিনের মত আজকেও ঘুমিয়ে পরলাম সীমাহীন বেদনা নিয়ে।

সকালে ঘুম থেকে উঠলাম একটু দেরী করে। আজ দশ বছর ধরে এই বাজে অভ্যাসটা আমার পিছু নিয়েছে। আমার জীবনের গভীর পূর্নতা নিয়ে মৌরী যখন এসেছিল তখন সাথে করে ভালো কিছু নিয়ম ও এনেছিল।যেমন ফজরের নামাজ পড়া। ঠিক সময়ে ঘুমানো। ঠিক ভাবে খাওয়া। আজ অনেকদিন হল কেউ শাসন করেনা। জীবনের গভীর থেকে গভীরতম শুন্যতার কষ্ট যে কতটা নির্মম তা আজ দশবছর ধরে অনুভব করছি। বরাবরের মতই একটু লেট করে ক্লাসে গেলাম। প্রধান শিক্ষক বললেন ‘আজ আপনাকে একটু আগে আসতে বললাম তাও লেট করলেন। ঘড়ির দিকে তাকালাম।

আসলেই দেরী হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে ক্লাসে ঢুকলাম। বাইরে দেখি একদল ছেলমেয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। একেক জন আসছে। আর আমি ভর্তির কাগজপত্র ঠিক করছি। এই সব বাচ্চাদের সাথে আগামি চার পাঁচ বছর থাকতে হবে ভাবতেই কেমন যেন লাগলো। বাসায় ফিরতে দুপুর হল। অনেক ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। সিদ্ধান্ত নিলাম আজ আর ছবি তুলতে যাবোনা। এছাড়া বেশ কয়েকটি রিল জমা পরে আছে। ছবিও ধোয়ানো হয়নি। গত মাসে বাসায় টাকাও পাঠানো হয়নি। ছোট বোনটার ফর্ম ফিলাপ নিশ্চই কর হয়নি। অনেক চাপ মাথার ওপর। হঠাত্‍ করে অনুধাবন করলাম বেশ অলস হয়ে যাচ্ছি। আগের মত চঞ্চলতা আর আমার মাঝে নেই।

নতুন ছাত্র ছাত্রীদের সাথে সময় বেশ ভালোই কেটে যায়। দু একজনের সাথে সখ্যতাও বেশ ভালোভাবে জমে উঠেছে। আজকাল ওদেরকেই নিজের বাচ্চার মত মনে হয়। দু একটা বাচ্চাকে বেশ ভালোও লাগে। মাঝেমাঝে ক্যান্টিন থেকে চকোলেট কিনে দেই। এর মাঝে নিনাদ নামের একটা মেয়েকে বেশ ভালো লাগে। ঠিক মৌরীর মত দেখতে। শান্ত চোখ। নিবিড় চাহুনী। অজস্র মায়া দিয়ে তৈরি সুন্দর একটি মেয়ে। মাঝেমাঝে ডেকে কথা বলি। সময় বেশ ভালোই কেটে যায়।

একদিন স্কুলে যাবার পথে দেখি গেটের সামনে ছোট খাট একটা জটলা। ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে দেখি নিনাদ কাঁদছে। তার পাশে কেউ একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। খুব সম্ভব Accident.

মৌরীকে চিনতে আমার কষ্ট হলোনা। সেই নীল চোখ। সেই কাজল কালো চোখের স্নিগ্ধতা। সেই পাতলা ঠোঁট। দশবছর আগে যেমন ছিল ঠিক তেমনই। একটুও বদলায়নি। শুধু একটু বার্ধক্যের ছাপ পরেছে। তার পরেও সেই টানটান চামড়ার উজ্বলতা। সবকিছু আগের মত। একটা ধাক্কার মত খেলাম। নিনাদ আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বলল ‘স্যার আম্মু হঠাত্‍ করে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। আপনি প্লিজ হাসপাতালে নিয়ে চলুন।

জীবনের এমন একটা অবস্থায় মৌরীকে দেখবো কখনো কল্পনাও করিনি। যে অধিকার একবার ছেড়ে দিয়েছি আজ তাকে স্বাধীকারের কর্তব্যে জড়াবো তা ভাবতে ও পারিনি। সংশয় আর দ্বিধাকে কাটিয়ে মৌরীকে গাড়ীতে তুললাম। সেই হাত।দশ বছর আগে যাকে শেষ বারের মত ধরেছি আজ সেই হাত ধরতে এত সংকোচ ক্যানো? কোথায় এত বাঁধা? এত সংকীর্নতা? খুঁজে পেলাম না। গাড়ীতে বসে নিনাদকে প্রশ্ন করলাম ’তোমার বাবা কোথায়?

ছোট্ট মেয়েটার শুকিয়ে যাওয়া মুখটি আরো ছোট হয়ে গেল। যা শুনলাম তার অর্থ মোটামুটি এরকম। ওর বাবা নেশা গ্রস্ত। প্রায়ই বাসার বাইরে থাকে। মাঝেমাঝে মৌরীর গায়েও হাত তোলে। হঠাত্‍ করেই খুব খারাপ লাগা শুরু করল। নতুন করে মৌরীর প্রতি প্রবল ভালোবাসা অনুভব করলাম। মৌরীকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে হাসপাতালের করিডোরে হাঁটাহাঁটি করছি। এমন সময় ডাক্তার এসে বললেন ‘রোগীর অবস্থা আশঙ্কা জনক। প্রচন্ড রক্ত চাপের ফলে sudden cardiac attack.এখনি icu তে নিতে হবে। আপনি রোগীর কি হন? আমি উত্তর দিতে পারলামনা। শুধু বললাম ‘আমি আমার সকল কিছুর বিনিময়ে এই মেয়েটাকে ভালোবাসতাম। আপনার একে বাঁচাতেই হবে ডাক্তার। এক জীবনে মেয়েটাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি এবার আমার কষ্ট পাওয়ার পালা।

মৌরীকে icu থেকে বের করা হল রাত একটায়। লাইফ সাপোর্ট ইন্সট্রুমেন্টকে ভুল প্রমানিত করে মৌরী চলে গেল। চিরতরে। মাঝরাতের আকাশে তখনো মেঘ জমেছিল। একটু পরেই শুরু হল প্রবল বর্ষন। আজ থেকে দশবছর আগের এক দিনেও বৃষ্টি হয়েছিল। সেদিন বৃষ্টির মাঝে যেমন করে আড়াল পরেছিল একটি ছেলের চোখের পানি আজ দশ বছর পরে রাতের আঁধার যেন নতুন করে সাক্ষ্য দিচ্ছি মৌরী চলে যাওয়ার। প্রকৃতি এক জীবনে একই ঘটনার বার পুনরাবৃত্তি ঘটায়…

___THE END___

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: